শিরোনাম

হাদির ওপর হামলার চরিত্র ভিন্ন, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৫-১২-১৩
ছবি সংগৃহীত

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে দিনের বেলায় সম্ভাব্য এক প্রার্থীকে গুলির ঘটনায় নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, এ ঘটনায় নির্বাচনের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারা বলছে, এমন পরিস্থিতি যাতে কেউ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।

রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে যেভাবে গুলি করা হয়েছে, সেটিকে সাধারণ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটি অশনিসংকেত এবং এমন ঘটনা ভালো নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করে মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক গণসংযোগ চলাকালে এর আগেও চট্টগ্রাম ও পাবনায় গুলির ঘটনা ঘটেছে। তবে ওসমান হাদির ওপর হামলার ধরন অন্য ঘটনাগুলোর তুলনায় ভিন্ন বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী–চান্দগাঁও–বায়েজিদ) আসনে গণসংযোগের সময় বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী ও মহানগর আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনায় একজন নিহত এবং আরও দুজন আহত হন। এরপর ২৭ নভেম্বর পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী–আটঘরিয়া) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও জেলা আমির আবু তালেব মণ্ডলের গণসংযোগ ঘিরে হামলা, গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

অন্তর্বর্তী সরকার এসব ঘটনাকে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে কোনো ধরনের সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। জনগণের নিরাপত্তা এবং প্রার্থীদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। দোষীরা যে-ই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’ একই সঙ্গে তিনি আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরাপদ পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক পক্ষ, কর্মী-সমর্থক ও নাগরিকদের শান্তি ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি পক্ষ নির্বাচন হতে দেবে না বলে হুমকি দিয়ে আসছিল এবং তাদের ছাড়া নির্বাচন হলে ভোট প্রতিহত করার ঘোষণাও এসেছে। এসবের অংশ হিসেবেই এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানায়, ওসমান হাদির ওপর গুলির ঘটনা তদন্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)সহ বিভিন্ন ইউনিট মাঠে নেমেছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)ও হামলাকারীদের শনাক্তে কাজ শুরু করেছে এবং ঘটনার নেপথ্যে কারা জড়িত, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনার পর গতকাল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের এক অনুষ্ঠানে বলেন, দেশ অত্যন্ত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একটি দল, গোষ্ঠী বা কিছু ব্যক্তি দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে তৎপর। তার মতে, ওসমান হাদির ওপর হামলা একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।

এদিকে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী এখনো গ্রেপ্তার হয়নি এবং বেশির ভাগ অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এর পাশাপাশি পুলিশের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে, যা পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। আওয়ামী লীগ শাসনামলে পুরানা পল্টনসহ আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে শাহজাহানপুরে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনার পেছনে ওই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কিছু নেতার নাম উঠে এসেছে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িত নেতাদের গ্রেপ্তারে বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান গতকাল নিজের ফেসবুক পেজে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখালে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা ফাঁকা প্রমাণিত হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গতকাল বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনবিরোধী পলাতক শক্তি আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো প্রার্থী নিজেকে অনিরাপদ মনে করলে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি রাতের পাশাপাশি দিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।

error: Content is protected !!