উত্তাল সমুদ্র, দুই মিটার উচ্চতার ঢেউ, প্রবল বর্ষণ আর বজ্রপাত—এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়েই গাজার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছে মানবিক সহায়তাবাহী বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’। ছোট ছোট জাহাজগুলো ঢেউয়ের দোলায় দুলছে কলার খোসার মতো। যেকোনো সময় ড্রোন হামলা বা সাবমেরিন থেকে বোমা নিক্ষেপের শঙ্কা সত্ত্বেও লাইফ জ্যাকেট পরে প্রস্তুত আছেন আরোহীরা।
বিশ্বব্যাপী ৫০০-এর বেশি মানবাধিকারকর্মী এতে অংশ নিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—বাংলাদেশ থেকে এতে যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশি কর্মী রুহি লরেন আখতার। মানবতার ডাকেই তাদের এই যাত্রা, যা বাংলাদেশের জন্যও গর্বের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের মানবিক অভিযানই প্রমাণ করে যে বিশ্বনেতারা গাজা সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশগুলোও কার্যত নীরব। অথচ ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিন নয়, বরং জর্ডান, সিরিয়া, লেবাননসহ আশপাশের দেশগুলো দখল করে বৃহত্তর রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে জাতিসংঘের ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দিলেও ইসরাইল তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করলেও তিনি পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে নির্বিঘ্নে সফর চালিয়ে যাচ্ছেন।
শহিদুল আলম শুধু বাংলাদেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে পরিচিত। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি বরাবরই সরব ছিলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত করেছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ বাংলাদেশি রুহি লরেন আখতার দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তায় কাজ করছেন। ২০১৫ সালে শরণার্থীদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মানবিক সংগঠন ‘রিফিউজি বিরিয়ানি অ্যান্ড বানানাস (RBB)’। এই সংগঠন খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন সামগ্রীসহ জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দিয়ে থাকে।
রুহির উদ্যোগ প্রথম আলোড়ন তোলে যখন তিনি ফ্রান্সের ডানকার্ক শরণার্থী শিবিরে কয়েক হাজার মানুষের জন্য বিরিয়ানি রান্নার ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে তার সংগঠন গাজা ও গ্রিসে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সম্প্রতি তিনি ‘নর্থ ইস্ট বাংলাদেশি অ্যাওয়ার্ডস’-এ ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা পেয়েছেন।
রুহি আখতারের নেতৃত্বে RBB ইতিমধ্যেই গাজায় একাধিক ট্রাক সহায়তা পাঠিয়েছে। খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্যসামগ্রী নিয়ে যাওয়া এসব সহায়তার অনেক অংশ পৌঁছালেও রাফাহ সীমান্ত বন্ধ থাকায় কিছু ট্রাক মিশরের আল-আরিশে আটকে আছে। তবুও স্থানীয় টিম নিজেদের উদ্যোগে বিতরণ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
ইসরাইলি অবরোধের মুখে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। খাদ্য ও পানির সংকটে প্রতিদিনই বাড়ছে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ। এমন পরিস্থিতিতে শহিদুল আলম, রুহি আখতারসহ শত শত অধিকারকর্মীর এই অভিযানকে অনেকেই প্রতীকী মানবতার লড়াই হিসেবে দেখছেন।
