ভূমির মালিক সরকার। দীর্ঘমেয়াদি লিজ চুক্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চা বাগানের সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াত চক্রের হাতে দখল ও বিক্রির শিকার ছিল। জাল দলিল দেখিয়ে এসব জমি প্লট আকারে বিক্রি করা হয়, এমনকি দখল করা জমিতে নির্মিত হয় বহু বাসাবাড়িও। প্রভাবশালী এই ভূমিখেকো চক্রের ভয়ে চা বাগান কর্তৃপক্ষও দীর্ঘদিন অসহায় হয়ে ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৩০ একর জমি, যার মূল্য কয়েকশ’ কোটি টাকা বলে জানান স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট শহরতলীর খাদিমপাড়া ইউনিয়নের খাদিমনগর চা বাগান সরকারি জমি লিজ নিয়ে পরিচালিত হয়। কিন্তু বাগানের সমতল অংশ দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছিল একটি শক্তিশালী স্থানীয় চক্র। বাগানের কিছু কর্মকর্তা, জাল দলিল প্রস্তুতকারী এবং প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা মিলে গঠন করে চক্রটি। তারা জাল দলিল তৈরি করে কম দামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করত। মাঝে মাঝে বাগান কর্তৃপক্ষ বা এলাকাবাসী প্রতিবাদ করলেও প্রতিপক্ষের প্রভাব ও হয়রানির কারণে তারা চুপ হয়ে যেতে বাধ্য হতো।
সূত্র জানায়, অনেকেই কম দামে জমি পাওয়ার লোভে জেনেশুনেই জাল দলিলের ভিত্তিতে এসব জমি কিনেছেন। জমি কিনে কেউ সেখানে বসতবাড়ি নির্মাণ করে নিজে বসবাস করছেন, কেউ দিয়েছেন ভাড়া। এ ছাড়া কেউ কেউ আবার চক্রের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে জমি কিনে প্লট আকারে পুনর্বিক্রিও করেছেন।
গত আগস্টের মাঝামাঝি সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন র্যাবের সাবেক আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। যোগদানের পর তিনি সাদাপাথর লুট বন্ধ ও উদ্ধার অভিযানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। এরপর ঘোষণা দেন সরকারি জমি উদ্ধারে ব্যাপক অভিযান চালানোর। ইতোমধ্যে তিনি রেলওয়ের মূল্যবান ভূমি দখলমুক্ত করেছেন। গত শুক্রবার খাদিমনগর চা বাগান পরিদর্শনে গিয়ে তিনি অবৈধ দখল উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এ সময় জালিয়াত চক্রের সদস্য মোজাম্মেল হোসেন লিটন তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়লে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠায়।
পরদিন শনিবার সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনুর রুবাইয়াৎ এর নেতৃত্বে দিনব্যাপী অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ৩০টি স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয় এবং উদ্ধার হয় প্রায় ৩০ একর সরকারি জমি। এক পর্যায়ে একটি ঘর থেকে অস্ত্র ও মাদকও উদ্ধার করা হয়। অভিযানে জালিয়াত চক্রের মূল হোতা খাদিমনগর চা বাগানের সাবেক ব্যবস্থাপক মোসাদ্দেক হোসেন কোরেশী এবং জাল দলিল প্রস্তুতকারী শাহজাহান ওমরকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদেরকেও এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠায়। পাশাপাশি সিলেটের বিমানবন্দর থানায় চক্রটির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোশনুর রুবাইয়াৎ জানান, দখলদার চক্র অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তারা উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে ভূমি আইনের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করে অভিযান সফল করা হয়েছে। সরকারি জমি উদ্ধারে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
