শিরোনাম

প্রতিদিন কতটা প্রোটিন দরকার? জানুন সঠিক পরিমাণ ও বাস্তব তথ্য

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৬-০১-১৩

প্রতিদিন আমাদের শরীরে ঠিক কত গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন—এই প্রশ্নটি অনেকের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। বিষয়টি অনেকের জন্যই চমকপ্রদ হতে পারে। প্রোটিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। গ্রিক শব্দ প্রোটোস থেকে ‘প্রোটিন’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘প্রথম’—এ থেকেই বোঝা যায় শরীরের জন্য এর গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।

প্রোটিন শরীরের পেশি গঠনে সহায়তা করে, হাড়কে শক্ত রাখে, ত্বক ও চুলের গঠনে ভূমিকা রাখে, রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে এনজাইম, হরমোন ও অ্যান্টিবডি তৈরিতেও প্রোটিন অপরিহার্য। সাধারণত ক্রীড়াবিদ বা বডিবিল্ডারদের বেশি প্রোটিন গ্রহণ করতে দেখা গেলেও অনেক সাধারণ মানুষও মনে করেন, তারা হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রোটিন খাচ্ছেন।

দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন কত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রোটিনের ন্যূনতম দৈনিক চাহিদা হলো শরীরের ওজন অনুযায়ী প্রতি কেজিতে ০.৮ গ্রাম। অর্থাৎ, প্রতি পাউন্ড ওজনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ০.৩৬ গ্রাম প্রোটিন।

এই মাত্রাটিকে Recommended Dietary Allowance (RDA) বলা হয়, যা শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং প্রোটিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা এড়াতে সহায়তা করে। এটি কোনো কঠোর সীমা নয়, বরং একটি ভিত্তিমাত্র।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারও ওজন যদি ৬০ কেজি হয়, তাহলে তার প্রতিদিন প্রায় ৪৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন।

নারীদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের চাহিদা

ধরা যাক, ৫০ বছর বয়সী একজন নারী, যার ওজন ১৪০ পাউন্ড এবং যিনি নিয়মিত ব্যায়াম করেন না—তার দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন হবে আনুমানিক ৫৩ গ্রাম।

তবে গর্ভাবস্থায় এই চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ভ্রূণের বৃদ্ধি, প্লাসেন্টা তৈরি, স্তন ও রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে গর্ভবতী নারীদের প্রতিদিন প্রায় ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বেশি প্রোটিন কি সত্যিই ভালো?

একজন সাধারণ সক্রিয় প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ক্যালরির প্রায় ১০ শতাংশ প্রোটিন থেকেই পূরণ হলেই যথেষ্ট। অথচ অনেক দেশে গড়ে মানুষ দৈনিক ক্যালরির প্রায় ১৬ শতাংশ প্রোটিন থেকে গ্রহণ করে।

এটি কি অতিরিক্ত?
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির শক্তি ধরে রাখতে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন উপকারী হতে পারে। তবে কখন এবং কীভাবে প্রোটিন খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পুষ্টিবিদ সারাদিনে ভাগ করে প্রোটিন গ্রহণের পরামর্শ দেন, একবারে বা রাতে অতিরিক্ত নয়।

বর্তমানে পুষ্টিবিষয়ক নির্দেশিকাগুলো শুধু পরিমাণ নয়, কী ধরনের প্রোটিন খাওয়া হচ্ছে—সে দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

‘প্রোটিন প্যাকেজ’ বুঝে খাওয়া জরুরি

প্রোটিন মানেই শুধু মাংস—এই ধারণা সঠিক নয়। গরু, মুরগি, ডিম ও দুধের পাশাপাশি বহু উদ্ভিদজাত খাবারেও পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া যায়। যেমন—

  • ডাল ও ছোলা

  • মটরশুঁটি ও অন্যান্য শিমজাত খাবার

  • বাদাম ও বীজ

  • পূর্ণ শস্য

  • কিছু সবজি

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রোটিনের সঙ্গে কী ধরনের চর্বি, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরে যাচ্ছে। কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার থেকে প্রোটিন গ্রহণ করাই স্বাস্থ্যসম্মত।

প্রোটিন বাড়ালে অন্য কোনো খাবার কমাতে হবে, যাতে মোট ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিশোধিত শর্করা—যেমন সাদা পাউরুটি ও মিষ্টি কমিয়ে প্রোটিন বাড়ানো ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।

মাছের পরিমাণ বাড়ানো স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হলেও লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস (যেমন সসেজ, সালামি) বেশি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ওজন কমাতে প্রোটিন কতটা কার্যকর?

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অনেকেই বেশি প্রোটিন গ্রহণের কথা ভাবেন। কিছু গবেষণায় এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। তাই প্রোটিনকে ওজন কমানোর একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

উপসংহার

প্রোটিন আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রোটিন খেলেই যে বাড়তি উপকার হবে, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং বিশেষ শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রোটিনের চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হলো সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে উদ্ভিদ ও প্রাণিজ—উভয় উৎস থেকেই পরিমিত ও বৈচিত্র্যময় প্রোটিন গ্রহণ করা। দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

error: Content is protected !!