শিরোনাম

যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দামে রেকর্ড, স্বস্তির আশা ক্ষীণ

: অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০২৫-০৭-২৭

যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। সাধারণত গ্রীষ্মকালের বারবিকিউ মৌসুমে গরুর মাংসের চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়তে দেখা যায়। তবে চলতি বছর দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে একাধিক গভীর কারণ, যা ক্রেতাদের দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ দামে কিনতে বাধ্য করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে এই দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গেল মাসে এক পাউন্ড (প্রায় আধা কেজি) গরুর কিমার গড় দাম ছিল ৬ ডলার ১২ সেন্ট, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে রান্না না করা বিফ স্টেকের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রতি পাউন্ডে ১১ ডলার ৪৯ সেন্ট, যা এক বছরে বেড়েছে ৮ শতাংশ।

মূল্যবৃদ্ধির এই ধারা অবশ্য নতুন নয়। গত দুই দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম বাড়ছে। কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে—চাহিদা বাড়লেও গরুর সংখ্যা দিন দিন কমছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারিতে দেশটিতে মোট গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৬৭ লাখ, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ কম এবং ১৯৫১ সালের পর সর্বনিম্ন। ফলে গরুর সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় দাম বেড়েই চলেছে।

এই উচ্চ দামের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক খামারি এখন গরু বিক্রি করে বেশি লাভ তোলার দিকে ঝুঁকছেন। প্রজননের জন্য গরু না রেখে তাৎক্ষণিক বিক্রির সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অনেকেই। টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ ডেভিড অ্যান্ডারসনের মতে, ভবিষ্যতে দাম পড়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।

খরা, গরুর খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি এবং গবাদিপশুর সংখ্যা হ্রাস—এসব মিলেই চলমান সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে যুক্ত হয়েছে মেক্সিকোতে একটি পরজীবীর সংক্রমণ এবং আমদানিকৃত মাংসের ওপর শুল্ক আরোপের আশঙ্কা, যা সরবরাহ আরও কমিয়ে দিতে পারে।

অ্যান্ডারসন জানান, প্রযুক্তির কারণে বড় আকৃতির গরু উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও, ২০২০ সাল থেকে চলমান খরার কারণে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক খামারি প্রজননক্ষম গরু জবাই করে ফেলেন। এতে সাময়িকভাবে বাজারে সরবরাহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে গরুর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একেকটি গরু বিক্রি হচ্ছে হাজার হাজার ডলারে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রতি ১০০ পাউন্ড (প্রায় ৪৫ কেজি) গরুর দাম এখন ২৩০ ডলারের বেশি।

তবে মাংসের দাম বাড়লেও ক্রেতাদের মধ্যে এখনও গরুর মাংসের প্রতি আগ্রহ কমেনি। মুরগি বা শূকরের মাংসের প্রতি ঝোঁকের চেয়ে গরুর মাংস—হোক তা স্টেক বা কিমা—এখনোই বেশি বিক্রি হচ্ছে।

মেক্সিকোতে একটি পরজীবী ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে গরু আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ, যুক্তরাষ্ট্রে জবাই হওয়া মোট গরুর প্রায় ৪ শতাংশই আসত মেক্সিকো থেকে। টেক্সাসে এ পরজীবী ছড়িয়ে পড়লে তা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির কৃষি কর্মকর্তারা।

যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৪০০ কোটি পাউন্ড গরুর মাংস আমদানি করে, যার বেশিরভাগ আসে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে। এই মাংসের ওপর এখনো ১০ শতাংশ হারে শুল্ক রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রাজিল থেকে আমদানি করা মাংসের ওপর সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন, যা কার্যকর হলে মাংস প্রক্রিয়াজাতকারীদের খরচ বেড়ে যাবে।

বর্তমানে বারবিকিউ মৌসুম থাকায় গরুর মাংসের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি অর্থনীতিবিদ গ্লিন টনসর বলছেন, এই চাহিদাই মূলত গরুর মাংসের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী করে রেখেছে। তার মতে, ক্রেতারা এখনও বিকল্পের দিকে না ঝুঁকে গরুর মাংসই কিনছেন, যার ফলে দাম কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ বার্ন্ট নেলসন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে খরা কিছুটা কমেছে এবং চারণভূমির অবস্থা উন্নত হয়েছে। পাশাপাশি শস্যের দামও কমছে। এতে করে খামারিরা এখন গরু বিক্রি না করে প্রজননের দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। তবে একটি গরু বাজারে তুলতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে, তাই এর প্রভাব বাজারে পড়তে সময় লাগবে।

প্রচলিতভাবে মৌসুম শেষে গরুর মাংসের দাম কিছুটা কমে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার সেই সম্ভাবনা খুবই সামান্য।

error: Content is protected !!