ছবি সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বাংলাদেশে আগামী বছরে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে এবং বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত আরও তীব্র হতে পারে—সরকার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সম্ভাব্য ‘সবচেয়ে খারাপ’ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, চলতি শতাব্দীর মধ্যেই দিনের গড় তাপমাত্রা সাড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এমনকি শীতকালেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যেতে পারে, যার ফলে ২১০০ সালের মধ্যে শীত মৌসুম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন বুধবার (১৯ নভেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অন্তত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ‘বাস্তবসম্মত’ ধরে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ দেখা যাবে, যার বেশিরভাগই বর্ষার আগে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে হবে। ঢাকার বিষয়ে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে রাজধানীবাসীকে বছরে কমপক্ষে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হবে—একটি বর্ষার আগে এবং আরেকটি বর্ষা-পরবর্তী অক্টোবর-নভেম্বরে। নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের জলবায়ু বিভাগের প্রধান হ্যানস ওলাভ বলেছেন, “এটাই আমাদের ভবিষ্যৎ, এবং এটি সবারই মোকাবিলা করতে হবে।”
২০১১ সাল থেকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর এবং নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট যৌথভাবে গবেষণা করছে। এবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তাদের তৃতীয় যৌথ কাজ, যেখানে পাঁচটি ভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। শতাব্দীর অবশিষ্ট সময়কে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—২০৪১ থেকে ২০৭০ এবং ২০৭১ থেকে ২১০০ সাল।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত গবেষক বজলুর রশিদ। তিনি জানান, ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষা শুরুর আগের তিন মাসে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২০ দিন তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষা শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে ৭০ দিনই তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি শৈত্যপ্রবাহের ঘটনাও প্রধানত উত্তর, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো থেকে শীত প্রায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২১০০ সালের দিকে শীতকাল প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তখন উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে মাত্র এক থেকে দুই দিন শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। বজলুর রশিদ বলেন, সব ধরনের গবেষণাতেই বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক মোট বৃষ্টির ৭১ শতাংশ পড়ে জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত ১১৮ মিলিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যার বেশিরভাগই হবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায়।
চলতি শতাব্দীর শেষ দিকে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও দ্রুত বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রতিবছর এ বৃদ্ধি হতে পারে সর্বোচ্চ ৫.৮ মিলিমিটার, যেখানে বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির হার ২.১ মিলিমিটার। এ অবস্থায় উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১৮ শতাংশ অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যেতে পারে।
‘সবচেয়ে খারাপ’ সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেলে ২১০০ সালের মধ্যে সুন্দরবনের প্রায় ৯১৮ বর্গকিলোমিটার (২৩ শতাংশ) এলাকা পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে।
