রমজানে প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক: সুস্থ অন্ত্র ও হজমের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৬-০২-২৭

রমজান মাসে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস ও খাবারের সময়সূচিতে বড় পরিবর্তন আসে। দীর্ঘ সময় উপবাস থাকা এবং ইফতার ও সাহ্‌রিতে তুলনামূলক ভারী খাবার গ্রহণের ফলে আমাদের অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এ উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে। এ সময় অন্ত্রের উপকারী ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষায় প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ গাট মাইক্রোবায়োম?

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্ত্রকে শরীরের ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলা হয়। আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন সংখ্যক অণুজীব বসবাস করে, যাদের একটি বড় অংশ উপকারী। এরা হজমে সহায়তা করে, পুষ্টি শোষণ বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করে এবং অন্ত্রের সুরক্ষা দেয়াল (গাট ব্যারিয়ার) অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ ভারী ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খেলে অন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। প্রোবায়োটিক অন্ত্রের দেয়ালে প্রতিরক্ষামূলক স্তর গঠনে সহায়তা করে, যা ক্ষতিকর টক্সিন রক্তে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। পাশাপাশি এগুলো শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড, বিশেষ করে বিউটিরেট উৎপাদনে সহায়তা করে, যা কোলনের কোষকে শক্তি জোগায় ও প্রদাহ কমায়।

রমজানে হজমের সমস্যায় প্রোবায়োটিকের ভূমিকা

রমজানে অনেকেই গ্যাস, পেট ফাঁপা, অ্যাসিডিটি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে এসব পরিপাকজনিত জটিলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে। একটি আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, রমজানকালে প্রোবায়োটিক গ্রহণকারীদের মধ্যে হজমসংক্রান্ত সমস্যার হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কম দেখা গেছে।

দেশীয় পর্যবেক্ষণেও দেখা যায়, যারা ইফতারে টক দই বা প্রোবায়োটিক পানীয় রাখেন, তাদের মধ্যে ক্লান্তি ও অ্যাসিডিটির প্রবণতা তুলনামূলক কম থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বড় একটি অংশ অন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সুস্থ গাট মাইক্রোবায়োম দীর্ঘ রোজায় শক্তি ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

কখন ও কীভাবে খাবেন প্রোবায়োটিক?

ইফতারে:
ইফতার শুরুতেই ভাজাপোড়া খাবারের আগে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ কিছু খাওয়া ভালো। যেমন—

  • চিনি ছাড়া টক দই

  • পাতলা লাচ্ছি

  • দেশীয় ঘোল

এসব খাবার অন্ত্রের অম্লতা কমাতে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

সাহ্‌রিতে:
সাহ্‌রির শেষ দিকে প্রোবায়োটিক গ্রহণ করলে সারা দিন অন্ত্র স্বস্তিতে থাকে। যেমন—

  • কলা বা আপেলের সঙ্গে টক দই

  • পান্তা ভাত (প্রাকৃতিকভাবে ল্যাকটোব্যাসিলাসসমৃদ্ধ)

ফল ও দই একসঙ্গে খেলে প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিকের সমন্বয় হয়, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে।

প্রিবায়োটিকও সমান জরুরি

শুধু প্রোবায়োটিক খেলেই হবে না; এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রিবায়োটিক—অর্থাৎ আঁশসমৃদ্ধ খাবার, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। রসুন, পেঁয়াজ, কলা, ওটস ও বিভিন্ন ডাল প্রিবায়োটিকের ভালো উৎস। ইফতার ও সাহ্‌রির মেনুতে এসব উপাদান রাখলে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় থাকে।

কিছু সতর্কতা

বাজারের অতিরিক্ত চিনি-সমৃদ্ধ দইয়ের পরিবর্তে ঘরে তৈরি টক দই বেছে নেওয়া ভালো। যাদের দুগ্ধজাত খাবারে অসুবিধা আছে, তারা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।

পরিশেষে বলা যায়, রমজানে খাদ্যতালিকায় সচেতনভাবে প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক যুক্ত করলে অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখা সহজ হয়। এতে হজম ভালো থাকে, ক্লান্তি কমে এবং রোজা পালনও হয় আরও স্বস্তিদায়ক।

error: Content is protected !!