শিরোনাম

উত্তরের খরা–তাপ–পানি সংকট: খাদ্যনিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি

: অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০২৫-০৯-০৪
ছবি সংগৃহীত

শেষ শ্রাবণের প্রখর রোদ মাথায় নিয়ে পৌঁছানো গেল নওগাঁর সাপাহার উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে। গ্রামীণ সরু পথে ঢুকতেই দেখা মিলল সাঁওতাল নারী বিজিয়ান মুর্মুর। বয়স পেরিয়েছে পঞ্চাশের ঘর। তিনি জানালেন, আগে গরমের রাতে পাখার হাওয়ায় ঘুম আসত, এখন বৈদ্যুতিক ফ্যান থাকলেও গরম কমে না। আগের মতো বৃষ্টিও হয় না।

ধান থেকে আমে ঝুঁকছে বরেন্দ্রভূমি

কখনো ধানচাষে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে এখন আমগাছের দখল। ভূগর্ভস্থ পানি শুকিয়ে যাওয়া এবং বৃষ্টির অভাব ধানচাষকে অলাভজনক করে তুলেছে। ফলে কৃষকেরা আমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। তবে বিজিয়ানের মতো ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলো, যারা ধান-সবজির ওপর নির্ভরশীল, তারা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।

নামছে ভূগর্ভস্থ পানি

সাপাহারের তিলনা, শিরন্টি ও সদর ইউনিয়নকে এখন খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একসময় যেখানে ৩০ ফুট মাটির নিচে পানির সন্ধান মিলত, সেখানে এখন ৪০–৫০ ফুট পর্যন্ত খুঁড়েও পাওয়া যায় না। কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, “মাটি মরে গেছে, ৩০ ফুট নিচে শুধু লাল বালু।” সেচের জন্য গভীর নলকূপ থাকলেও অনেক সময় তা অকেজো হয়ে পড়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, গত চার দশকে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় পানির স্তর এক থেকে তিন মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে দেখা গেছে—বর্ষায় পানিস্তর পুনর্ভরণও আর আগের মতো হচ্ছে না।

বৃষ্টি কমছে, তাপমাত্রা বাড়ছে

চলতি বছর জুনে দেশে ২০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে ঘাটতি আরও বেশি। দীর্ঘমেয়াদে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ধারাবাহিকভাবে কমছে। গবেষণা বলছে, ১৯৪৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বছরওয়ারি গড়ে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে নদী-বিলেও। একসময় সেচের বড় উৎস ছিল সাপাহারের জবই বিল, এখন সেখানে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি থাকে না।

অন্যদিকে তাপমাত্রাও দ্রুত বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণা অনুযায়ী, রাজশাহীতে প্রতি দশকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে ধানে চিটা বাড়ছে, পোকার উপদ্রবও বেশি হচ্ছে।

কৃষি উৎপাদনে চাপ

দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদিত হয় উত্তরাঞ্চলে। কিন্তু বাড়তি তাপমাত্রা ও পানির ঘাটতির কারণে বোরোর উৎপাদন কমছে। নাচোলে এ বছর বোরোর আবাদ প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, বদলে মসুর ও ভুট্টার চাষ বাড়ছে। কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচও এ অঞ্চলে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম মনজুরে মাওলা জানান, আগে যেখানে ২–৩ ধরনের পোকার উৎপাত ছিল, এখন কৃষকদের ৮০টির বেশি পোকার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। বৃষ্টির অভাব ও উষ্ণতা এই পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে

গবেষণা বলছে, যদি তাপমাত্রা আরও ৩.৫–৫.৭ ডিগ্রি বেড়ে যায় এবং পানির প্রবাহ কমে আসে, তবে উত্তরাঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তা ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, কেবল ধান-গমের উৎপাদন দিয়েই খাদ্যনিরাপত্তা মাপা যাবে না। পানি ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি, জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সব মিলিয়েই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

জলবায়ু অভিযোজনে উত্তরাঞ্চল উপেক্ষিত

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় উপকূলকেন্দ্রিক মনোযোগ বেশি হলেও উত্তরাঞ্চলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। খরা–উষ্ণতার শিকার এলাকা হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (ন্যাপ) এ অঞ্চলের জন্য উদ্যোগ সীমিত।

অভিযোজন ক্লিনিক: টিকে থাকার নতুন পথ

নওগাঁর সাপাহারের লক্ষ্মীপুর গ্রামে দেখা গেল ভিন্ন ছবি। এখানে ব্র্যাকের সহায়তায় চলছে “অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক”। কৃষকেরা জৈব চাষ করছেন, কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করছেন, আর বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে বিশেষভাবে পুকুর সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষক গণেশ মুর্মু বললেন, “যতটুকু জমি আছে, তাতে সারা বছর ফসল ফলানোর ব্যবস্থা করছি।”

২০২৩ সাল থেকে চালু হওয়া এ প্রকল্প এখন দেশের প্রায় ৩০০ গ্রামে বিস্তৃত। তবে উত্তরাঞ্চলের অনেক খরাপ্রবণ উপজেলায় এ ধরনের প্রকল্প এখনো নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনা ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে উত্তরাঞ্চল অচিরেই বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।

 

 

error: Content is protected !!