আরপিও সংশোধনে নতুন বিতর্ক: জোটবদ্ধ হয়েও নিজ দলের প্রতীকে ভোট বাধ্যতামূলক

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৫-১১-০৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নতুন এই অধ্যাদেশে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলেও প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রতীকে ভোট করতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, পাশাপাশি আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে বিএনপি ও তাদের সমমনা কয়েকটি দল, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি ও আরও কিছু দল এই সংশোধনীকে স্বাগত জানিয়ে বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে নির্বাচন তপশিল ঘোষণার আগে এই অধ্যাদেশে আবারও সংশোধন আসতে পারে বলে ইসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে ‘জোটবদ্ধ হয়েও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার বাধ্যবাধকতা’ বিধানটি বাতিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলো বলছে, ছোট দলগুলোর প্রতীকের পরিচিতি না থাকায় জোটবদ্ধ হয়ে আলাদা প্রতীকে ভোট করলে তাদের প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে এবং আশা করছে— ভোটের তপশিল ঘোষণার আগেই আরপিও ফের সংশোধন করা হবে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাধারণত ভোটের তপশিল ঘোষণার পর কোনো আইন বা বিধি সংশোধন করা হয় না, কারণ নির্বাচন তখন ঘোষিত সময়ের আইনি কাঠামোতেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার বা নির্বাচন কমিশন সংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগে তপশিলের পরও সংশোধন আনতে পারে। ফলে গেজেট প্রকাশ মানেই যে এটি চূড়ান্ত, তা নয়; প্রয়োজনে তপশিলের আগে বা পরে আবারও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধনের খসড়া অনুমোদন পায়। এরপর বিএনপি জোটবদ্ধ হয়ে একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ বাতিলের বিরোধিতা করে। বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয় এবং বিএনপির আপত্তি আমলে নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবরও আসে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানায়— কোনো দলের চাপে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করতে। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয় ৪ নভেম্বর রাতে সংশোধিত আরপিওর গেজেট প্রকাশ করে, যেখানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত হয়েছে।

সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী—

  • কোনো আদালত কর্তৃক ‘পলাতক’ ঘোষিত ব্যক্তি সংসদ সদস্য প্রার্থী হতে পারবেন না।

  • কোনো আসনে একমাত্র বৈধ প্রার্থী থাকলেও ‘না ভোট’ দেওয়ার সুযোগ থাকবে, অর্থাৎ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচিত হতে পারবেন না।

  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ, বিমান ও কোস্টগার্ড) যুক্ত করা হয়েছে।

  • নির্বাচনকালীন গেজেট প্রকাশ থেকে ফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার ‘দুর্নীতিমূলক কাজ’ হিসেবে গণ্য হবে।

  • প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিলের সাত দিন আগে বা নির্বাচিত হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে ঋণখেলাপি হলে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা যাবে।

  • অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে।

  • প্রার্থীর জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া, নতুন আরপিও অনুযায়ী ইসি শিগগিরই দল ও প্রার্থীদের আচরণবিধি চূড়ান্ত করবে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, জোটবদ্ধ হলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোটের বাধ্যবাধকতা। বিএনপি বলছে, এটি তাদের জোটভিত্তিক নির্বাচনী কৌশলকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং ঐক্য বিনষ্ট করবে। অন্যদিকে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপি মনে করছে, এই বিধান প্রতিটি দলের নিজস্ব পরিচয় ও প্রতীকের মর্যাদা রক্ষা করবে।

বিএনপি ও সমমনা ছোট দলগুলো সংশোধিত আরপিওতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা মনে করছে, একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ থাকলে জোটের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বিএনপি শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারত, যা কিছু মহলের অস্বস্তির কারণ। তাই ওই পক্ষের প্রভাবেই বিতর্কিত এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা তপশিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই বিধান বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও চাপ অব্যাহত রাখবে।

গেজেট প্রকাশের পরদিন বিএনপির শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ইসির সঙ্গে বৈঠকে গিয়ে আপত্তি জানায়। দলটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত না নিয়েই ইসি ইচ্ছামতো আরপিও সংশোধন করেছে— এটি সঠিক হয়নি।”

গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান বলেন, “জোটবদ্ধ নির্বাচনে প্রতিটি দলের আলাদা প্রতীকে প্রচার চালানো কঠিন। তাই আগের নিয়মেই একই প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ রাখতে হবে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গণভোট ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে আগে থেকেই মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে আরপিও সংশোধনের গেজেট রাজনীতির মাঠে নতুন উত্তাপ ছড়াবে বলেই তারা মনে করছেন।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, “গেজেট প্রকাশ মানে এটি অপরিবর্তনীয় নয়। সরকার বা নির্বাচন কমিশন চাইলে যে কোনো সময় পরিবর্তন করতে পারে। তবে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোট হলে সময়ের সীমাবদ্ধতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।”

ইসি সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার আগে আরপিও নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন নির্বাচনী পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। ফলে তপশিল ঘোষণার আগে আরেক দফা সংশোধনের সম্ভাবনাও বাতিল করা যাচ্ছে না।

তবে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আরপিওর গেজেট পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য নেই। ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।”

 

error: Content is protected !!