স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে খাদ্যতালিকায় রাখুন যেসব খাবার

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: 2026-07-23
ছবি : সংগৃহীত

মস্তিষ্ক শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। মনোযোগ ধরে রাখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, নতুন কিছু শেখা কিংবা জটিল সমস্যার সমাধান—প্রতিটি কাজের জন্য মস্তিষ্কের প্রয়োজন পর্যাপ্ত শক্তি ও সঠিক পুষ্টি। তাই মস্তিষ্কের সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস উপলক্ষে ভারতের নিউরোসার্জন ডা. শ্রীকান্ত শর্মা জানিয়েছেন, শরীরের মোট ব্যবহৃত শক্তির প্রায় ২০ শতাংশই মস্তিষ্ক কাজে লাগায়। ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। বয়স ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের মতো কিছু বিষয় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

অন্ত্রের সুস্থতা, মস্তিষ্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের মধ্যে রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া মানুষের মেজাজ, স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে খাদ্যতালিকায় নিয়মিত দই, ঘোল, ছোলা, রাজমা ও বিভিন্ন ধরনের মিলেট রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শ্রীকান্ত শর্মা। এসব খাবার অন্ত্রে উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি শরীরে প্রদাহ কমিয়ে মস্তিষ্কের সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

মস্তিষ্কের জন্য উপকারী স্বাস্থ্যকর চর্বি

চর্বিযুক্ত সব খাবারই শরীরের জন্য ক্ষতিকর—এমন ধারণা সঠিক নয়। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগে সহায়তা করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ভালো উৎস হিসেবে স্যালমন ও সারডিন মাছ, আখরোট এবং তিসির বীজ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খান

বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। এ ধরনের খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে মস্তিষ্কের কোষের সুরক্ষা এবং জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

এ জন্য বেরিজ, পালং শাক, টমেটো, গাজর ও বিটের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. শ্রীকান্ত শর্মা।

ভিটামিন বি৬, বি১২ ও ফোলেটের গুরুত্ব

মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য ভিটামিন বি৬, বি১২ এবং ফোলেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব ভিটামিন শরীরে হোমোসিস্টেইন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। শরীরে এই উপাদানের মাত্রা বেড়ে গেলে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সবুজ শাকসবজি, ডাল, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং ফোর্টিফায়েড খাদ্য এসব ভিটামিনের ভালো উৎস। তবে নিরামিষভোজীদের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন বি১২-এর বেশিরভাগ উৎসই প্রাণিজ খাবার। এ ভিটামিনের ঘাটতি হলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।

বেছে নিন জটিল কার্বোহাইড্রেট

মস্তিষ্কের প্রধান জ্বালানি হলো গ্লুকোজ। তবে শরীরে গ্লুকোজ সরবরাহের ক্ষেত্রে সব ধরনের কার্বোহাইড্রেট সমান ভূমিকা রাখে না। অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং পরে তা দ্রুত কমেও যেতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের খাবারের পরিবর্তে ওটস, মিলেট, পূর্ণ শস্য এবং বিভিন্ন ধরনের ডাল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব খাবার তুলনামূলক ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করতে পারে।

শুধু খাবার নয়, জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার যুক্ত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

error: Content is protected !!