নন্দিত শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম খান

: আব্দুর রশীদ লুলু
প্রকাশ: 2026-10-18
সিরাজুল ইসলাম খান

নন্দিত এক শিক্ষকের নাম সিরাজুল ইসলাম খান। সিলেট জেলার ওসমানী নগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী খাগদিওর গ্রামের অধিবাসী এ নন্দিত শিক্ষক তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের সুদীর্ঘ ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) বছর (১৯৬৯-২০১৪) দেওয়ান আব্দুর রহিম হাইস্কুল এন্ড কলেজ (দেওয়ান বাজার, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট)- এ কাটিয়ে ৩০ এপ্রিল ২০১৪ অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর বিদায়ে ছাত্র-ছাত্রী ও সহকর্মীরা অনেকে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। ১৩ অক্টোবর ২০১৫ ছাত্র-ছাত্রী ও এলাকাবাসী দিয়েছেন গণসম্বর্ধনা। যা তাঁর কৃতিত্ব ও সাফল্যের স্বাক্ষর বহন করে। গণসম্বর্ধনার আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ। ১৯৫৪ ইং সালের ০১ মে জন্মগ্রহণকারী সিরাজুল ইসলাম খানের পিতা মরহুম আলহাজ্ব ওয়ারিছ খান ছিলেন এলাকার একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি দীর্ঘদিন খন্দকার বাজার ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মা মরহুমা মাহমুদা খাতুন ছিলেন একজন সুগৃহিনী। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম খান প্রথম। তাঁর ছোট ভাই সুলতান মাহমুদ খান প্রাইমারী শিক্ষক। অন্যরাও নিজ নিজ অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত।
সিরাজুল ইসলাম খান ছিলেন ঐতিহ্যবাহী দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক। তাঁর বিষয় ছিল ইংরেজি। তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। উপস্থাপন কৌশল, উচ্চারণ ভঙ্গি সব মিলিয়ে তিনি ইংরেজির মতো কঠিন বিষয়কে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে সহজ করে তুলতেন। শিক্ষকতার মহান পেশা ও ইংরেজি বিষয়কে ভালোবেসে তিনি কর্মজীবনে ইংরেজি বিষয়ের ওপর ইএলটিআইপি (ঊখঞওচ), বৃটিশ কাউন্সিল, টক-ইধহমষধফবংয ঞৎঁংঃ, ব্র্যাকসহ অন্যান্য সংস্থা থেকে এক ডজনেরও বেশি ইংরেজি পড়ানোর মেথোডলজির ওপর সফলতার সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া এ কৃতি শিক্ষক ভারতের মেঘালয়া রাজ্যের একমাত্র রাজ্য পরিচালিত ইউনিভার্সিটি-নর্থ ইস্টার্ণ হিল ইউনিভার্সিটিসহ দেশে এবং বিদেশে বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, সেমিনার ও ওয়ার্কশপে যোগদান করেছেন।
সংস্কৃতিমনা, বন্ধুবৎসল, সজ্জন ও মধুর স্বভাবের অধিকারী সিরাজুল ইসলাম খান শিক্ষকতায় যোগদানের পূর্বে তিন বছরকাল সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রীণ কার্ডধারী অভিবাসী ছিলেন। তাঁর সুযোগ্য স্ত্রী সুগৃহিনী শাহানা খানম চৌধুরী। তাঁর এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। ছেলে আবু মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান কৃতিত্বের সাথে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস পাশ করেছেন। ১ম মেয়ে আছেন স্বামীর সাথে আমেরিকার মিশিগান ষ্টেইটে, ২য় মেয়ে স্বামীর সাথে আছেন লন্ডনে, ৩য় মেয়ে আছেন স্বামীর সাথে গ্রেট বৃটেনের কেন্ট এরিয়ায়, ৪র্থ এবং ৫ম মেয়ে অধ্যয়নরত।
বয়স ষাট পেরিয়েও তিনি এক প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন। বলা যায়, চির সবুজ ও চির তরুণ ছিলেন। বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মী-সহযোগীদের সান্নিধ্য দারুণ উপভোগ করতেন, আড্ডা জমিয়ে রাখতেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, সিরাজুল ইসলাম খান ভাগ্যবান ও সুখী এক মানুষ ছিলেন। সমাজে এমন মানুষ বিরল। প্রথম জীবনে তিনি একজন নাট্যকর্মী হিসেবেও খ্যাতিমান ছিলেন। ছিলেন ফুটবলের ভালো রেফারীও। পারদর্শী ছিলেন ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায়।
এমন গুণী মানুষের সান্নিধ্য লাভ সৌভাগ্যের বিষয়। তাঁর সাথে আলাপ করতে ভালো লগতো। তাঁর জ্ঞান গর্ভ কথা শুনতেও ভালো লাগতো। আমার ভাবতে ভালো লাগে যে, তাঁর মতো প্রজ্ঞাবান মানুষের সান্নিধ্য আমি পেয়েছি। আমার জন্য বিষয়টি আরো আনন্দের যে, তিনি আমার স্ত্রী যোবায়েদা বেগম এবং আমার ছেলে আনিসুল আলম নাহিদ দু’জনেরই শিক্ষক। অন্যান্যদের মতো আমার স্ত্রী এবং আমার ছেলে দু’জনই তাদের প্রিয় ‘সিরাজ স্যার’কে নিয়ে গর্বিত। দেখা সাক্ষাৎ হলে তিনি আমার স্ত্রীর মেধার প্রশংসা করতেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিতেন। আমি আবেগ-আপ্লুত হতাম। হিংসা-হানাহানিপূর্ণ এই সমাজে ধর্মপ্রাণ, রুচিশীল, মুক্তমনা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম খান ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছেন। অনেকে প্রতিষ্ঠিতও।
জীবদ্দশায় অন্যান্যদের সাথে আনোয়ারা হোমিও হল (হোমিও চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান), আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা) এবং আনোয়ারা ফাউন্ডেশন (মানব ও প্রকৃতি কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠান) থেকেও তাঁকে অভিনন্দিত করা হয়েছে। তিনি ১৭ এপ্রিল ২০১৯ আমেরিকায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিশেষে সুশিক্ষক সিরাজুল ইসলাম খান এর রূহের মাগফেরাত কামনা করছি।

লেখক: সম্পাদক- আনোয়ারা (শিকড়সন্ধানী প্রকাশনা), আনোয়ারা হোমিও হল, আনোয়ারা কমপ্লেক্স-লুলু সেন্টার, দেওয়ান বাজার, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট। মোবাইল- ০১৭২৮-০৭৩৮৫২

error: Content is protected !!