রাত প্রায় দশটা। সারা দিনের কর্মব্যস্ত মানুষ যার যার ঘরে ফিরে হয়তো রাতের খাবার খাচ্ছে। কিংবা হয়তো কেউ কেউ রাত জেগে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত আছে। এমনি এক সময় আমি শ্রদ্ধেয় আব্দুর রশীদ লুলু সম্পদিত যতীন্দ্র মোহন সোম স্মারক বইটি পড়তে বসি। এই বইটিতে অনেক গুণী ব্যক্তিবর্গ যতীন্দ্র মোহন সোমকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। দেখে মনে হল আমি মনে হয় কার্পণ্য করলাম কিছু স্মৃতির কথা না লিখে। সাথে সাথে কাগজ কলম নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করলাম। সম্ভবত ১৯৯৭/১৯৯৮ সাল বালাগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ মাঠে প্রবাসী বালাগঞ্জ ওসমানীনগর এডুকেশন ট্রাষ্টের বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান ছিল। দুই ঘটিকার সময় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠান শুরু হয় এক ঘন্টা পরে। সেখানে আমিও নবগ্রাম হাজী মোঃ ছাইম উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে বৃত্তির সনদ এবং পুরস্কার আনার জন্য উপস্থিত হই। দেখলাম যথাসময়ে সোম বাবু সেখানে উপস্থিত হয়ে স্টেজের সামনে নিচের প্রথম সারিতে বসে আছেন। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে আসেন মহান জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার মরহুম আলহাজ্ব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। স্পিকার মহোদয় মঞ্চে এসেই দেখলেন সোমবাবু নিচের সামনের সারিতে বসে আছেন। দেখেই প্রধান অতিথি মহোদয় তাড়াহুড়া করে বললেন, দাদা আপনি সেখানে কেন মঞ্চে আসুন এবং তিনি নিজেই অগ্রসর হয়ে সোমবাবুকে পাশের চেয়ারে বসালেন। আমি তখন অবাক হয়েই তাকিয়ে রইলাম এবং ভাবতে লাগলাম এত বড় মাপের একজন মানুষ সোমবাবু। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। যতীন্দ্র মোহন সোম ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি এবং দক্ষ শালিশ বিচারক। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ। তিনি সিলেট জেলার প্রায় প্রতিটি থানায় শালিশ বিচারের সাথে জড়িত ছিলেন। সোমবাবু যে শালিশ বৈঠকে উপস্থিত আছেন তা সমাধান হয়নি এমন দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।
সোমবাবু উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না, তবে অনেক উচ্চ শিক্ষিত লোকও তাঁর ভাষার ইন্দ্রজালে আটকা পড়ে বোকার মত চেয়ে থাকতেন। তিনি কথা বলতেন বইয়ের ভাষায় এবং বক্তব্য অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ছিল। সোম বাবুর এক দৌহিত্র, সারসপুর প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক সরল কান্তি সোম আমার সহপাঠি থাকায় আরো কয়েক বার একেবারে কাছে থেকে দেখেছি সোম বাবুকে। আমি আমাদের এলাকার বিভিন্ন শালিশ বৈঠকে পেছনে দাঁড়িয়ে সোমবাবুর কথা শুনতাম। তাঁর সারগর্ভ কথা, কথা বলার ভংগী, সংস্কৃত মেশানো বাংলা আমাদের বুঝতে কষ্ট হত। দ্বিধা-দ্বন্ধ সংঘাত-সন্দেহ প্রবণ সমাজে কোন উত্তেজনাপূর্ন মুহুর্তে মানুষের সামনে তাঁর সুললিত কথা মানুষকে সম্মোহিত করে তুলত। তিনি আমাকে বলেছিলেন তুমি অনেক ছোট, তোমাদের লেখাপড়ার এখনই সময়। ভালো করে লেখাপড়া কর। সমাজ এবং জীবনের কিছু করতে পারবে। ১৭/১১/১৯৯৯ ইং তারিখে তিনি ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে গমণ করেছেন। সোম বাবু আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর কর্ম, মেধা, সেবা ও মননশীলতা আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। তিনি ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। আমরা চাই সোমবাবুর মত গুণী ব্যক্তি সমাজে আরো জন্ম হোক।
লেখক: পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, উসমানপুর ইউনিয়ন, ওসমানীনগর, সিলেট। মোবা: ০১৭২১২২৭১৩৪
