২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাটের একাধিক ঘটনা, বাড়ছে উত্তেজনা

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: 2026-09-27
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর তিনটি এলাকায় পৃথক ঘটনায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে জমি দখলের চেষ্টা, মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে রাতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুট এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তিনটি ঘটনাতেই বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ, বিভিন্ন মালামাল লুট এবং স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর পেছনে কারা ছিলেন, তা এখনো তদন্তাধীন। মিরপুরের ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মোহাম্মদপুরে জমি দখলের অভিযোগ

রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে কয়েকশ লোক নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে একটি জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপরও হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাদের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টদের একজন।

মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার দাবি, চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ৮ নম্বর রোডে ভবনসহ ১১ কাঠা জমি তার মায়ের মালিকানাধীন। কিছুদিন ধরে মো. মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরী স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শনিবার সকালে ২০০ থেকে ৩০০ জনের একটি দল জমিটির সামনে গিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। বাধা দিতে গেলে কয়েকজন বাসিন্দাকে মারধর করা হয়। পরে জমির ভেতরে থাকা অফিসকক্ষের তালা ভেঙে এসি, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল, দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে টিন ও বাঁশ দিয়ে প্লটটির চারপাশ ঘিরে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, মোস্তাকের রহমান খোকন চৌধুরী এলাকায় জমি কেনাবেচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার বাড়ি ভোলায়। ঘটনার সময় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্য এবং বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন বলে সূত্রটির দাবি।

প্রত্যক্ষদর্শী সাজেদা বলেন, জমিটির পাশেই তাদের বাড়ি। ঘটনার সময় তারা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন তাদেরও মারধর করা হয়। বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলার সময় জহির নামের একজনকেও ঘরে ঢুকে মারধর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় একটি সূত্রের অভিযোগ, হামলার নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদপুর থানার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নুরুল ইসলাম নান্নু এবং তাদের কর্মী নুরনবী দেওয়ান ও জামাল হোসেন। তাদের নির্দেশেই ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হামলা বা ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তার দাবি, জমিতে থাকা স্থাপনা আলম হোসেনের ম্যানেজার সাদেকের কাছ থেকে তিনি কিনেছেন এবং গত চার মাস ধরে সেগুলো ভেঙে নিচ্ছেন। জমির মালিকানা নিয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও দাবি করেন।

নুরুল ইসলাম আরও বলেন, স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নাম ব্যবহারকারী কিছু ব্যক্তি হামলা ও লুটপাট করেছে। তার ভাষ্য, তৃতীয় একটি পক্ষ তাদের মদদ দিয়েছে, যারা বর্তমানে জমিটির মালিকানা দাবি করছে। হামলাকারীরা তার কেনা মালামালও নিয়ে গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম বলেন, শনিবার সকালে বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি প্লট দখলের চেষ্টা করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। জমিটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে জানিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। আদালতের রায় অনুযায়ী মালিকানা নির্ধারিত হবে বলেও জানান তিনি।

মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট

এর আগে রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলার পর প্রতিষ্ঠানটির চারটি অফিস ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সেখান থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ১১ লাখ টাকা নগদ, জেনারেটর, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, চারটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, টিকাদান সরঞ্জাম, দুটি টেলিভিশনসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র লুট করা হয়। এ ঘটনায় বিএনপি নেতাসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

তবে হামলার পরও স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের পাশে খোলা আকাশের নিচে বসে স্থানীয়দের চিকিৎসা এবং শিশুদের টিকা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপির কর্মীরা জানান, মাসব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে হামলার পরদিনও শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন অসুস্থতা নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার সময় পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ না আসার অভিযোগও উঠেছে।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আক্তার বলেন, শুক্রবার রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে হামলা ও ভাঙচুর শুরু হয়। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও রাত ৩টা পর্যন্ত লুটপাট ও ভাঙচুর চলে। ওই সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে বেঁধে রাখে এবং তাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। এ কারণে দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনায় পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দল বা মত বিবেচনা না করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ অস্বীকার করে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বলেন, তিনি কোনোভাবেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীও এতে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

এ ঘটনায় মো. সোহেল, মো. জুয়েল, মো. জিহাদ হাসান ও মো. রাবিব নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। লুট হওয়া দুটি গাড়ি ও কিছু মালামালও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা

এদিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

স্টুডিওর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন হঠাৎ সেখানে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। হামলাকারীরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায়। তাদের কয়েকজনের হাতে চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।

পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে স্টুডিওর কর্মীরা টয়লেটে গিয়ে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা সেখানেও গিয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে যায়।

স্টুডিওর এক কর্মকর্তা জানান, সেখান থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে হামলায় স্টুডিওর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী আহত হননি।

ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন না সালমান মুক্তাদির। খবর পাওয়ার পর বিমানে ঢাকায় এসে তিনি স্টুডিও পরিদর্শন করেন এবং পরে ফেসবুক লাইভে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন।

সালমান মুক্তাদিরের দাবি, স্টুডিওতে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের শুটিংয়ের ফুটেজ, সরঞ্জাম ও কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিল। সেগুলো নিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে বলে তিনি জানান। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট আর্থিক হিসাব করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ক্লায়েন্টদের জন্য করা বিভিন্ন কাজের ফুটেজ ও সরঞ্জাম স্টুডিওতে সংরক্ষিত ছিল। সেগুলো হারিয়ে যাওয়ায় একাধিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরেক ফেসবুক লাইভে ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্টুডিও দেখিয়ে সালমান মুক্তাদির বলেন, তাদের স্টুডিও সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার দাবি, দেশে সৃজনশীল কাজ ও শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এ ধরনের স্টুডিও খুব বেশি ছিল না।

ঘটনার জন্য বিএনপির লোকজনকে দায়ী করে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেন, চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় প্রতিশোধ হিসেবে হামলা চালানো হয়েছে। তবে তার এই অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কোনো নেতার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

হামলার পর কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তারা যেন আতঙ্কিত না হন এবং আবারও কাজে ফিরে আসেন। নিজের সৃজনশীল কাজ বন্ধ না করার ঘোষণাও দেন তিনি।

সালমান মুক্তাদির জানান, স্টুডিও নির্মাণের সময় তার স্ত্রী ও সহকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অনেক কর্মী রাত জেগে স্টুডিওর নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করেছেন।

তিনি আরও বলেন, হামলার কারণে ভয় পেয়ে সৃজনশীল কাজ থেকে সরে যাবেন না। বরং আরও বড় পরিসরে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

ঘটনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে না থাকলে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।

হামলার ঘটনায় মামলা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে মামলার বিস্তারিত তথ্য, ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

তিন ঘটনায় তদন্তের অপেক্ষা

রাজধানীর পৃথক তিন এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মোহাম্মদপুরে জমি দখলের চেষ্টা, মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং ইসিবিতে একটি সৃজনশীল স্টুডিওতে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

মিরপুরের ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর ও ইসিবির ঘটনাতেও অভিযোগের সত্যতা, হামলাকারীদের পরিচয় এবং ঘটনার নেপথ্যের কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।

error: Content is protected !!