ভালোবাসা অফুরান

: আব্দুর রশীদ লুলু
প্রকাশ: 2026-08-02
ছবি: প্রতীকী

বর্ষার এক বর্ষণমূখর সকালে ইমার কোল আলো করে জন্ম নিলো মুনা। পাড়া-পড়শী উপছে পড়ছে এক নজর নবজাতককে দেখতে। এরই মাঝে ঠেলে-টুলে একবার আতুড় ঘরে ঢুকে রাজু।
এক পলকের দেখাতেই মনটা ভরে গেছে রাজুর। মনে মনে শুকরিয়া আদায় করে বার বার। খোদা তাকে এমন একটা ফুটফুটে পরীর মতো মেয়ে দিয়েছে। মেয়েটা তার তরুণী স্ত্রী ইমার চেয়েও সুন্দর হয়েছে। মনটা ফুরফরে হয়ে যায় আনন্দে।
ইতোপূর্বে আত্মীয়-স্বজনের বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে পছন্দের বঁধু ইমাকে ঘরে তুলে একবার শুধু এমন আনন্দ পেয়েছিল রাজু। আজ আবার সেই পুরানো আনন্দ খেলে যা দেহ-মনে। মুহুর্তে সে হারিয়ে যায় ফেলে আসা দিনগুলোতে।
আবাল্য গ্রাম, কৃষি আর কৃষকের দূরবস্থা দেখে দেখে রাজু স্বপ্ন দেখেছে এসবের পরিবর্তনের। সে অনুযায়ী লেখাপড়া শেষে চাকুরী নামক সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে ফিরে এসেছে গ্রাম। হাতে কোদাল, কাঁধে লাঙ্গল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ক্ষেত-খামারে। বৈজ্ঞানিক ও উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদে সচেষ্ট হয়েছে। পাড়া-পড়শীদের উদ্বুদ্ধ করেছে তাকে অনুসরণে। ধীরে ধীরে সারা গ্রামে একটা জাগরণ এসেছে। প্রথম প্রথম যারা তাকে নিয়ে হাসি টাট্টা করেছে, এখন তারা তাকে সমীহ করে চলে। ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই কথায় কথায় রাজু ভাই, রাজু চাচা বলে আন্তরিক সম্বোধন করে।
গ্রামে একটু একটু সুবাতাস বইতে থাকার ফাঁকে রাজু সবাইকে সংগঠিত করতে থাকে। তারপর এক বিকেলে গ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গ্রামবাসীকে নিয়ে গঠন করে সমাজ কল্যাণ সমিতি। বহুমুখী যার কার্যক্রম।
রাজুর দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ। প্রতি সপ্তাহে সমিতির সভা, সঞ্চয় সংগ্রহ, মৎস্য চাষ, হাঁস-মোরগ, গরু-ছাগল পালন, স্বাবলম্বন, পরিবেশের উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে সদস্য/সদস্যাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকরণ। সর্বোপরি উন্নয়ন ও উৎপাদন বিষয়ে নিজের পড়াশুনা। সব মিলে কর্মব্যস্ততার মাঝে তার সময় কাটে ভালো। এতো কাজ এতো ব্যস্ততা তবু তার কষ্ট লাগে না- পরিবর্তন ও উন্নয়নের আনন্দে। সময় সময় সে খোদার কাছে দু’হাত তুলে শুকরিয়া আদায় করে, সাহায্য চায়।
এমনি কর্মব্যস্ততার মধ্যে ফাঁক করে একদিন বেরিয়ে পড়ে রাজু সহপাঠি মুজিবের আমন্ত্রণে। উদ্দেশ্য বেড়ানোর ফাঁকে মুজিবদের গ্রামটা দেখে আসা। তাদের গ্রামের আর্থ-সামাজিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেয়া।
মুজিব তাকে হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানায়। ঘোরে ঘোরে গ্রামটা দেখায়। গ্রামের সমাজকর্মীদের সাথে আলাপ-পরিচয় হয়। বিভিন্ন দিক দিয়ে গ্রামের পরিবর্তনের আভাষ দেখে মুগ্ধ হয় রাজু। ভালো লাগার দোলায় দুলে। এরই মাঝে আলাপ হয় মুজিবের ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া বোন ইমার সাথে। প্রথম দেখায় ইমা প্রাণ কাড়ে রাজুর। রাজু তাই সারাক্ষণ গুন গুন করে- “মন মানেনি, চোখ থামেনি, তাকিয়ে ছিলাম সব ভুলে। ভালোলাগার দোলায় এ মন ভাসিয়ে নিলে …..।”
তারপর এক শুভক্ষণে ইমাকে বঁধু করে ঘরে তুলে আনে রাজু। দেহ-মন কানায় কানায় ভরে ওঠে আনন্দে-আনন্দে। স্বপ্লীল বাসরে রাজু প্রত্যাশা করেছে একটি ছোট্ট-সুন্দর সুখের নীড়। একটি সুখী-সুন্দর জীবন।
দাম্পত্য জীবনে ইমা মিতব্যয়ী জীবন যাপণের সাথে সাথে হাঁস-মোরগ, গরু-ছাগল পালন ও পরিচর্যাসহ ঘর-গৃহস্থালীর কাজে সাহায্য করছে অহর্নিশ। যদিও সংসার ধর্ম পালন করতে করতে রাজুর কখনো কখনো মনে হয়, ইমা তার প্রত্যাশাটা পুরোপুরি পালন করতে পারছে না। অজান্তে কখনো তাই দীর্ঘশ্বাস ঝরে।
নবজাতক মেয়ের মুখটা দেখে মনের নিভৃত কোণের দু:খটা ভুলে যায় সে। সেই কোন শৈশবে সে তার মাকে হারিয়েছে। শত চেষ্টা করেও সে তার হারিয়ে যাওয়া মায়ের মুখ মনে করতে পারে না। আজ মেয়ে পেয়ে মনে হয় সে যেন তার হারানো মাকেই খুঁজে পেয়েছে। আনন্দে অভিভূত রাজু আপন মনে আওড়ায়-মা, আমার মা।
সাথে সাথে হৃদয়ের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে-ইশ, এমন দিনে মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয় অনেক খুশী হতেন। অ-নে-ক অ-নে-ক আনন্দ হতো।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাজু এমন তরো ভাবনায় ডুবে যায়। বৃষ্টি ঝরে অবিরাম। এরই মাঝে আস্তে করে কাঁধে একটা কোমল হাত পড়ে। আচমকা পেছন ফিরে রাজু। চোখে চোখ পড়ে পারভীন ভাবীর। স্বভাব সুলভ মিষ্টি হাসি ভাবীর মুখে।
ঃ এমন একটা চাঁদ বদন মেয়ে পেলে। আমাদের একটু মিষ্টি-টিষ্টি ……।
চৈতন্য ফিরে পায় রাজু। ছাতাটা টেনে নিয়ে নেমে পড়ে রাস্তায়। পিচ্ছিল গ্রামীণ রাস্তা। শক্ত ধীর পায়ে হাটে আর ভাবে। মেয়ে পাওয়ার আনন্দটা ক্রমশ: মিলিয়ে গিয়ে পিতার দায়িত্ব বোধটা বড় হয়ে ওঠে। মেয়ের লালন-পালন, লেখাপড়া, মানুষ করা, বিয়ে আরো কতো কী!
ঃ ইউরেকা, ইউরেকা।
পথ চলতে চলতে হঠাৎ প্রায় চেচিয়ে ওঠে রাজু। নিজে নিজে এমন করে কথা বলায় বিস্ময়ে জনৈক পথিক ফিরে তাকায়। পাগল-টাগল ভাবে।
রাজু সবই অনুভব করে। কিন্তু খারাপ লাগে না। বরং চলার গতিবেগ বাড়ায়। তাকে তাড়াতাড়ী বাজার থেকে ফিরতে হবে। মেয়ের জন্মদিনেই তাকে মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য একটা কিছু করতে হবে।
বাজারে ঢুকেই আগে গাছের চারা খুঁজে রাজু। ভালো জাতের ক’টা চারা তাকে কিনতে হবে। ভাগ্যিস এখন বাজারে ভালো চারা পাওয়া যায় অনায়াসে।
ঃ রাজু ভাই, এই মেঘ-বৃষ্টির দিনে বড়ো ব্যস্ত হয়ে বাজারে যে!
চারা কিনতে কিনতে দেখা হয়ে যায় গ্রামবাসী মিন্টুর সাথে। মিন্টুকে বড়ো ভালোবাসে রাজু। এসএসসি পাশ সহজ-সরল ছেলে। কিন্তু খুব কর্মঠ। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে মিন্টুকে পেয়ে খুশী হয় রাজু।
ঃ বুঝলে মিন্টু, এখন চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। আমার ভাগ্য লক্ষ্ণী মেয়েটা ঠিক সময়ে এসেছে। আজ তার জন্মদিনে ক’টা গাছ লাগিয়ে আমি তার ভবিষ্যত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই।
গাছের সাথে সদ্যজাত মেয়ের ভবিষ্যত নিরাপত্তার সম্পর্কটা কি মিন্টু সহজে বুঝতে পারে না। হাঁ করে সে রাজুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
রাজু বিষয়টা উপলব্ধি করে। তারপর বুঝিয়ে বলে সামান্য টাকায় লাগানো এই গাছগুলোর একটু পরিচর্যা করলে অনায়াসে মেয়ের সাথে সাথে বেড়ে ওঠবে। মেয়ে বড় হলে পড়াশোনা কিংবা বিয়ের কাজে টাকার দরকার হলে গাছ বিক্রি করা যাবে। সহজে নগদ টাকা পাওয়া যাবে।
রাজুর কথা শেষ হতে না হতে মিন্টু তাকে বুকে আঁকড়ে ধরে-তুমি এতো ভালো, এতো বুদ্ধিমান রাজু ভাই!
রাজু মিটিমিটি হাসে। বিষয়টা সমিতির আগামী সভায় সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হবে। তারপর মিন্টুকে নিয়ে রাজু বউয়ের জন্য শাড়ী, পাড়া-পড়শীর জন্য মিষ্টি এবং মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কেনা-কাটা করে বাড়ীর পথে পা বাড়ায়।
সওদা-পাতি মিন্টুর হাতে দিয়ে রাজু নিজে বয়ে নিয়ে চলে তার মেয়ের মতো প্রিয় চারাগুলো। চারা তো নয়, যেন তার ফুটফুটে মেয়েকেই কোলে তুলে চলছে। পথ চলতে চলতে সে বারে বারে চারাগুলোর কচি ডগার দিকে তাকায়।
সারা দিনের ক্লান্তি তার গায়ে লাগে না, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির আনন্দে।
 শ্রীনাথপুর, ০৮ জুলাই ১৯৯৯

 আব্দুর রশীদ লুলু: ইসলাম ধর্ম, হোমিওপ্যাথি ও কৃষি বিষয়ক লেখক ও গবেষক। আনোয়ারা হোমিও হল, দেওয়ান বাজার, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট। মোবাঃ ০১৭১৮ ৫০৮৯৮০ ষঁষঁপবহঃবৎ২০১৩@মসধরষ.পড়স

error: Content is protected !!