ছবি : প্রতিকী
সিলেট জেলার ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ একটি উপজেলা বালাগঞ্জ। বালাগঞ্জ যেমন দেশ-বিদেশ খ্যাত অনেক কৃতিন্তান জন্ম দিয়েছে, তেমনি রয়েছে এর অনেক গৌরব গাঁথা ইতিহাস-ঐতিহ্য। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো জরুরী ক্ষেত্রে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ উপজেলার সম্ভাবনা প্রচুর।
আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই মুক্তিযুদ্ধে বালাগঞ্জের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও আত্মদান। সর্বোপরি বৃহত্তর বালাগঞ্জের কৃতি সন্তান মেজর জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক।
বালাগঞ্জের ঐতিহ্যের এক ধারক- শীতলপাটি। শীতলপাটি বালাগঞ্জকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি দান করেছে। এই প্রযুক্তির যুগে ‘কুটি কামলা’র তৈরী শীতলপাটির চাহিদা আগের মতো না থাকলেও এর খ্যাতি-পরিচিতি এখনো বিশ্বজুড়ে রয়েছে। লেখক-শিক্ষক আব্দুল মঈদ চৌধুরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় ‘বালাগঞ্জের তেঘরীয়া গ্রামের একজন শিল্পীর তৈরী একটি ফরমায়েশী শীতলপাটি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজ দরবারে স্থান পেয়েছিল। এটি ওই সময় চার’শ টাকায় ক্রয় করা হয়েছে।
চাহিদা ও ব্যবহারের গুণে বাংলা সাহিত্যেও শীতলপাটি স্থান পেয়েছে। অনেক কবি-সাহিত্যিকের লেখায় শীতল পাটির বর্ণনা রয়েছে। এর ব্যবহার ও গুণকীর্তন করে চমৎকার কবিতা লিখেছেন লোকসাহিত্যের গবেষক ও কবি-গীতিকার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন-
“আর মাছ বানাইতে কন্যা লয় ছালি মাটি
ইলিশ বানাইতে কন্যা বিছায় শীতল পাটি।”
বালাগঞ্জের অনেক মানুষ ইংল্যান্ড-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করে দেশের উন্নয়নে বলিষ্ট ভূমিকা রাখছেন। বৃহত্তর বালাগঞ্জের অন্যতম কৃতি সন্তান, দেশ-বিদেশ খ্যাত শ্রমিক নেতা আফতাব আলী (১৯০৫-১৯৭১) আমাদের প্রবাসীদের পথিকৃত। তাঁর সূচিত পথ ধরে দেশের বিশেষত সিলেটের অনেকেই আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সপরিবার প্রতিষ্ঠিত। শ্রমিক নেতা আফতাব আলী আজীবন শ্রমিক ও প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠা ও অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করেছেন নিরলসভাবে।
সুদূর প্রবাসে বসে রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার পাশাপাশি অনেক বৃহত্তর বালাগঞ্জবাসী লেখালেখির মাধ্যমে দেশের জন্য কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ক’জন লেখক হলেন- গিয়াস উদ্দিন আহমদ, নজরুল ইসলাম বাসন, ময়নুর রহমান বাবুল, মুহাম্মাদ শরীফুজ্জামান, ফজির আহমেদ (আশরাফ), সরওয়ার আলম প্রমুখ।
আশার কথা, প্রবাসে কর্মব্যস্ত জীবন-যাপন করেও অনেক সচেতন বালাগঞ্জবাসী সাংগঠনিকভাবেও দেশের উন্নয়নে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছেন। এর মধ্যে ইংল্যান্ডে বালাগঞ্জবাসীর সফল তিনটি সংগঠন হচ্ছে- ০১. প্রবাসী বালাগঞ্জ আদর্শ উপজেলা সমিতি (স্থাপিত ১৯৮৮); ০২. বালাগঞ্জ যুব সমিতি (স্থাপিত-১৯৯০) ও ০৩. প্রবাসী বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর এডুকেশন ট্রাষ্ট (স্থাপিত-১৯৯১)।
বলাবাহুল্য, ইংল্যান্ডে উক্ত সংগঠনগুলোর ঈর্ষণীয় কর্মতৎপরতা তথা সাফল্য সিলেটের অন্যান্য উপজেলার প্রবাসীদের উক্তরূপ সংগঠন গড়ে তুলতে উৎসাহ যুগিয়েছে।
ধর্ম, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৃহত্তর বালাগঞ্জের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। স্বনামধন্য বালাগঞ্জের ক’জন শিক্ষাবিদ হলেন- গোলাম মোস্তফা (আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনারত। তাঁর স্ত্রী মিসেস নাজমা মোস্তফা একজন বিশিষ্ট লেখিকা), হুসন আরা আহমদ, মোঃ আব্দুল আজিজ, ডঃ সানী ওসমানী (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত) ও মহিউদ্দিন শীরু প্রমুখ।
বালাগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রভৃতি তুলে ধরে প্রকাশিত বই/সংকলনের প্রকাশনা অনেক। অন্যান্য বিষয়ের সাথে বালাগঞ্জবাসীর সুখ-দুঃখ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বর্তমানে বালাগঞ্জ থেকে প্রকাশিত কটি প্রকাশনা (নিয়মিত/অনিয়মিত) হচ্ছে- সাপ্তাহিক বালাগঞ্জ বার্তা (সম্পাদক ও প্রকাশক শাহাব উদ্দিন শাহীন), আনোয়ারা (সম্পাদক ও প্রকাশক আব্দুর রশীদ লুলু), আয়না (সম্পাদক ও প্রকাশক জিল্লুর রহমান জিলু), বালাগঞ্জ ভিউজ (সম্পাদক ও প্রকাশক মুহাম্মদ আব্দুল জলিল), বালাগঞ্জ প্রতিদিন (প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক- মুহাম্মাদ শরীফুজ্জামান), বালাগঞ্জের আওয়াজ (সম্পাদক ও প্রকাশক এস.এম হেলাল) ও চাষাবাদ (সম্পাদক ও প্রকাশক আনিসুল আলম নাহিদ) প্রভৃতি।
তথ্য প্রযুক্তিতেও বালাগঞ্জ সংযুক্ত রয়েছে। দেশে-বিদেশে অনেক বালাগঞ্জবাসী তথ্য প্রযুক্তিতে কাজ করছেন। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও উদ্যমী অনেক বালাগঞ্জবাসী দেশ-বিদেশে তথ্য আদান-প্রদান করছেন স্বাচ্ছন্দে। নতুন প্রজন্ম সংযুক্ত হচ্ছেন তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়কে। বালাগঞ্জের একজন খ্যাতিমান হোমিও চিকিৎসক প্রেমদা রঞ্জন দাশ ছিলেন দেশ-বিদেশে খ্যাতিমান। কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সরাসরি কাজ করা বালাগঞ্জের একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান মরহুম আব্দুল মালিক কৃষি কল্যাণ কেন্দ্র (স্থাপিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৪)। এ কেন্দ্রের প্রতিপাদ্য ‘কৃষি ও কৃষকের কল্যাণে কাজ করি, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ ও পৃথিবী গড়ি’। এছাড়াও বালাগঞ্জের দু’টি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- আনোয়ারা হোমিও হল গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ (স্থাপিত: ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৯১) এবং আল কুরআন শিক্ষা ও চর্চা কেন্দ্র (স্থাপিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩)।
বালাগঞ্জের অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, ভারত বিরোধী রেফারেন্ডামে, পাকিস্তান বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বালাগঞ্জবাসীর বলিষ্ট ভূমিকার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও রয়েছে প্রচুর সফলতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে (যেমন- প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প প্রভৃতিতে) রয়েছে বালাগঞ্জের প্রচুর সম্ভাবনা। বলাবাহুল্য, নিবন্ধের পরিসর বৃদ্ধির আশংকায় বালাগঞ্জের অফুরন্ত সম্ভাবনার দিকগুলোতে সুুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হলো না।
প্রিয় বালাগঞ্জকে নিয়ে এ নিবন্ধ লিখতে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছে দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সচেতন সকল বালাগঞ্জবাসীকে বলি- ছোটখাট বিভিন্ন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সমৃদ্ধ-সম্ভাবনাময় বালাগঞ্জ আমাদের ডেকে যাচ্ছে। আসুন আমরা আমাদের পূর্বসুরীদের পদাংক অনুসরণ করে যে যার অবস্থান থেকে (ব্যক্তিগত/ সম্মিলিতভাবে) বালাগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে অংশগ্রহণ করি। অন্যদের কাছে আমরা দৃষ্টান্ত হই।
লেখক: সম্পাদক- আনোয়ারা (শিকড়সন্ধানী প্রকাশনা), আনোয়ারা হোমিও হল, আনোয়ারা কমপ্লেক্স-লুলু সেন্টার, দেওয়ান বাজার, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট।
মোবাইল- ০১৭২৮-০৭৩৮৫২
