ছবি: সংগৃহীত
হৃদরোগের চিকিৎসায় ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, কোলেস্টেরল পরীক্ষা ও রক্তচাপ মাপার মতো পরীক্ষা নিয়মিত করা হয়। তবে হৃদযন্ত্রের পাশাপাশি কিডনির স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কারণ হৃৎপিণ্ড ও কিডনি পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটির কার্যকারিতা কমে গেলে অন্য অঙ্গটির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিডনি রোগ যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তেমনি হৃদরোগ থেকেও কিডনির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ—দুই অঙ্গের জন্যই বড় ঝুঁকির কারণ।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ব্যথা, প্রস্রাবে পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকলেও কিডনির যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
কিডনির অবস্থা জানতে যেসব পরীক্ষা কাজে আসে, সেগুলো হলো—
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা জানা যায়। এটি শরীরের একটি বর্জ্য পদার্থ, যা স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনি রক্ত থেকে ছেঁকে শরীরের বাইরে বের করে দেয়।
ক্রিয়েটিনিনের ফলসহ বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে চিকিৎসকরা আনুমানিক গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট বা eGFR নির্ণয় করেন। এর মাধ্যমে কিডনি রক্ত কতটা কার্যকরভাবে পরিশোধন করছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
eGFR-এর মাত্রা অন্তত তিন মাস ধরে ৬০ mL/min/1.73 m²-এর নিচে থাকলে তা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে একবারের অস্বাভাবিক ফলের ভিত্তিতে কিডনি রোগ নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করতে হয়।
কিডনির প্রাথমিক ক্ষতি শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হলো ইউরিন অ্যালবুমিন-টু-ক্রিয়েটিনিন রেশিও বা UACR।
সুস্থ কিডনি সাধারণত রক্তের অ্যালবুমিন নামের প্রোটিন শরীরের ভেতরেই ধরে রাখে। কিন্তু কিডনির ফিল্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যালবুমিন প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যেতে পারে।
UACR-এর মাত্রা ৩০ mg/g-এর বেশি হলে, এমনকি eGFR স্বাভাবিক থাকলেও, কিডনির সমস্যার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তাই রক্ত পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেও প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
eGFR ও UACR কিডনির স্বাস্থ্য সম্পর্কে আলাদা ধরনের তথ্য দেয়। ২০২৪ সালের KDIGO গাইডলাইনেও কিডনির কার্যকারিতা ও অ্যালবুমিনের উপস্থিতি—দুটিই মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রক্তচাপের সঙ্গে হৃদযন্ত্র ও কিডনির স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই রক্তচাপ দীর্ঘদিন বেশি থাকা কিংবা ওষুধের পরও নিয়ন্ত্রণে না এলে কিডনির পরীক্ষা করানোর বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস হৃদরোগ ও কিডনি রোগ—উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। দীর্ঘদিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির রক্ত ছাঁকার ক্ষুদ্র কাঠামোগুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর অন্যতম প্রাথমিক ইঙ্গিত হতে পারে প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি।
এ কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন এ ধরনের রোগীদের বছরে অন্তত একবার eGFR ও UACR পরীক্ষার পরামর্শ দেয়।
সাধারণ ইউরিন টেস্ট বা প্রস্রাবের পরীক্ষা থেকেও কিডনির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এতে প্রস্রাবে রক্ত, প্রোটিন কিংবা অন্যান্য অস্বাভাবিক উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়তে পারে।
তবে সাধারণ প্রস্রাব পরীক্ষা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে eGFR বা UACR-এর বিকল্প নয়। বরং অন্যান্য পরীক্ষার ফলের সঙ্গে এটি চিকিৎসককে রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে সহায়তা করে।
কিডনি রোগের অন্যতম সমস্যা হলো এটি অনেক সময় নীরবে অগ্রসর হয়। বিশেষ করে হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই হৃদযন্ত্রের চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনির কার্যকারিতা, প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের উপস্থিতি এবং রক্তচাপের ওপর নজর রাখা উচিত। পরীক্ষার ফল অস্বাভাবিক হলে নিজের মতো সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
