ছবি: সংগৃহীত
চা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। তবে সাধারণ চায়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে গ্রিন টির চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। স্বাদে কিছুটা তেতো হলেও এতে থাকা পলিফেনল, ক্যাটেচিন ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কারণে পানীয়টি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
তবে গ্রিন টি কোনো জাদুকরী পানীয় নয়। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে পরিমিত গ্রিন টি যুক্ত করলে এর সম্ভাব্য উপকার পাওয়া যেতে পারে।
গ্রিন টির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। এর উৎপত্তি চীনে বলে ধারণা করা হয়। প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ সালের দিকে চীনের সম্রাট শেন নংয়ের গরম পানিতে দুর্ঘটনাবশত চা পাতা পড়ে যায়। পানীয়টির স্বাদ ও সুবাস তার পছন্দ হয়। এরপর ধীরে ধীরে চা পানের সংস্কৃতি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
চীন থেকে এশিয়ার অন্যান্য দেশে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চায়ের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় এটি অভিজাতদের পানীয় হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে গ্রিন টি প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়।
চা পাতা অতিরিক্ত অক্সিডাইজ না করে গ্রিন টি তৈরি করা হয়। ফলে পাতার কিছু প্রাকৃতিক উপাদান তুলনামূলকভাবে অক্ষুণ্ন থাকে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যাটেচিন, যা এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেচিন ও ক্যাফেইন শরীরের শক্তি ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু গ্রিন টি পান করে দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুমই ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি।
গ্রিন টির পলিফেনল ও ক্যাটেচিন শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব উপাদান কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু গবেষণায় গ্রিন টি পানকারীদের রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রায় সামান্য ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপরও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা রয়েছে।
তবে গ্রিন টি কখনোই হৃদ্রোগের চিকিৎসা বা নির্ধারিত ওষুধের বিকল্প নয়।
গ্রিন টির কিছু উপাদান শরীরে গ্লুকোজ বিপাকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কয়েকটি গবেষণায় নিয়মিত গ্রিন টি পানকারীদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিন টিতে ক্যাফেইনের পাশাপাশি এল-থিয়ানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। এই দুই উপাদান মনোযোগ ও মানসিক সতর্কতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু গবেষণায় গ্রিন টি পান এবং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু কার্যক্রমের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এল-থিয়ানিন মস্তিষ্ককে কিছুটা শিথিল অবস্থায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। ফলে অনেকের ক্ষেত্রে গ্রিন টি পান করলে প্রশান্তি অনুভূত হতে পারে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের চিকিৎসা হিসেবে গ্রিন টির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
গ্রিন টির পলিফেনল অন্ত্রের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এ কারণে হজম ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে গ্রিন টির সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা চলছে।
তবে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা আইবিএসের মতো নির্দিষ্ট সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে গ্রিন টি ব্যবহার করা উচিত নয়।
গ্রিন টি ও ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়।
কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে গ্রিন টি পান করার সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, গ্রিন টি ক্যানসার প্রতিরোধ করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তাই ক্যানসার প্রতিরোধে শুধু গ্রিন টির ওপর নির্ভর না করে তামাক এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিমিত পরিমাণে গ্রিন টি সাধারণত অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ। তবে এতে ক্যাফেইন থাকায় অতিরিক্ত পান করলে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, মাথাব্যথা কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া চা ও কফিতে থাকা কিছু যৌগ খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে। যাদের আয়রনের ঘাটতি বা আয়রন-স্বল্পতাজনিত রক্তস্বল্পতা রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত গ্রিন টি এড়িয়ে চলা ভালো। বিশেষ করে খাবারের সঙ্গে সঙ্গে না খেয়ে কিছুটা বিরতি রেখে পান করা যেতে পারে।
গ্রিন টি কতটা পান করা যাবে, তা ব্যক্তির ক্যাফেইন সহনশীলতা ও পানীয়টিতে থাকা ক্যাফেইনের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে কয়েক কাপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে অতিরিক্ত পান করার প্রয়োজন নেই।
স্বাস্থ্যকর রাখতে গ্রিন টিতে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি না দেওয়াই ভালো। স্বাদ পরিবর্তনের জন্য সামান্য লেবু বা আদা যোগ করা যেতে পারে।
সকাল বা দুপুরে গ্রিন টি পান করা সুবিধাজনক হতে পারে। রাতে পান করলে ক্যাফেইনের কারণে কারও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। আবার খালি পেটে পান করে অস্বস্তি হলে খাবারের পর পান করা যেতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, গ্রিন টি কোনো ‘ম্যাজিক ড্রিংক’ নয়। এর কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকলেও সুস্থ থাকার জন্য সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসবের পাশাপাশি পরিমিত গ্রিন টি দৈনন্দিন স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অংশ হতে পারে।
