প্রসঙ্গ: আনোয়ারা

: নন্দলাল শর্মা
প্রকাশ: 2026-10-04

একটি শিকড় সন্ধানী প্রকাশনার নাম ‘আনোয়ারা’। কলেবর সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ব্যাপ্তি অসাধারণ। ২০০৪ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ১৫ জুন ২০১৯ এই পনের বৎসরে প্রকাশিত হয়েছে ৫২টি সংখ্যা। না কোন বড় নগর বা শহর থেকে নয়, জেলা বা উপজেলা সদর থেকেও নয়, সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার বাংলাবাজার থেকে এই সাময়িক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ডিমাই ৮/১ সাইজে সাধারণত ২৪ পৃষ্ঠার এই সাময়িকী একজন রুচিশীল ব্যক্তির একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন। এই ব্যক্তি ‘আনোয়ারা’র সম্পাদক ও প্রকাশক। তাঁর নাম আব্দুর রশীদ লুলু। তিনি পেশায় হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজারে তাঁর একটি হোমিও চিকিৎসালয় আছে- নাম আনোয়ারা হোমিও হল। ধর্মপ্রাণ, সাহিত্যপ্রেমিক, সজ্জন, রুচিশীল, মুক্তমনা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এই মানুষটির একটি স্বপ্নের নাম ‘আনোয়ারা’। মাসিক বা ত্রৈমাসিক কোন লেবেল তিনি এঁটে দেননি এর গায়ে। কারণ অনেক মাসিক পত্রিকা বৎসরে চার পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশ করে। এর চেয়ে অনিয়মিত প্রকাশনা বলাই নিরাপদ।
আব্দুর রশীদ লুল লেখা সংগ্রহ করেন, সম্পাদনা করেন, মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য তাঁকে প্রতি সংখ্যার জন্য বার কয়েক সিলেট আসতে হয়। আনোয়ারা প্রতি সংখ্যায় থাকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গল্প, রম্যরচনা, কবিতা, ছড়া এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা প্রসঙ্গ। বিভিন্ন সূত্র থেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের নানা তথ্য কণিকা সংগ্রহ আনোয়ারার একটি বিশেষ আকর্ষণ। এ ছাড়া থাকে গ্রন্থ আলোচনা, কোন বিশেষ বিষয়ে নিবন্ধ। যেমন বিভিন্ন লেখকের লেখা প্রথম বই সম্পর্কে বহু লেখকের স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ এ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। একজন লেখকের বই কম বয়সেও প্রকাশিত হতে পারে (যদি তিনি বিশেষ সৌভাগ্যবান হন) আবার পরিণত বয়সেও প্রকাশিত হতে পারে। অনেকে লেখালেখি শুরু করেন ছাত্র জীবনেই আবার অনেকে অনেক দে-রি-তে, প্রৌঢ় বয়সে— স্বাভাবিক কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর বিনোদনের জন্য। যেভাবেই হোক কোনো লেখকের প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা সাধারণত সুখপ্রদ হয় না। নবীন লেখক হলে কোন প্রকাশক তাঁর বই প্রকাশে সম্মত হবেন না। আবার লেখালেখি করে কিছু যশ লাভ করেছেন তাঁদের মধ্যেও প্রকাশক সদয় হয়ে বই প্রকাশ করেছেন এমন লেখকের সংখ্যা এখনও হাতে গোণা। আর এখন লেখকের অর্থ দিয়ে প্রকাশক হওয়া একটি ভাল ব্যবসা। তাই লেখকের প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের কাহিনী বড়ই চমকপ্রদ। এ বিষয়টি বাছাই করে সম্পাদক একটি দায়িত্বশীল কাজ করেছেন। এখন এ ধরণের প্রকাশিত প্রবন্ধ নিয়ে তিনি একটি গ্রন্থ প্রকাশের চেষ্টা করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ সফল হলে আমরা খুশি হব।
সাধারণ জ্ঞানের চর্চা এবং হোমিওপ্যাথির নানা বিষয় প্রকাশে আনোয়ারা গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। নানা গ্রন্থ, পত্র পত্রিকা প্রভৃতি থেকে তথ্য আহরণ করে এই বিভাগগুলো সাজানো হয়। এতে সম্পাদকের অনুসন্ধিৎসা, সুমেধা, সুরুচি ও জ্ঞানস্পৃহার পরিচয় মেলে। স্থানীয় অনেক ব্যক্তিত্বের পরিচিতি প্রকাশ ‘আনোয়ারা’র আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। আমরা গুণিজনের স্বীকৃতি প্রদানে বড়ই কৃপণ। ঈর্ষা, বিদ্বেষ প্রভৃতি আমাদের সহজাত ধর্ম। বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তাই অপরের প্রশংসা করতে আমরা কুন্ঠিত। এই দায়ভাগ থেকে মুক্ত হয়ে আনোয়ারা নবীন-প্রবীণ জীবিত বা প্রয়াত গুণী ব্যক্তির জীবন ও কর্ম আলোচনায় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এ পর্যায়ে কয়েকটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। গুণী নির্বাচনে আনোয়ারা ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় প্রভৃতির উর্ধ্বে উঠে সাদাকে সাদা বলে। একজন সম্পাদক হিসেবে এটা তাঁর সার্থকতা। আর এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম সাহিত্য পত্রিকা সিলেটের ‘আল ইসলাহ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম মুহম্মদ নূরুল হকের কথা। তিনিও বিভিন্ন মতের লেখকের লেখা প্রকাশে উদার ছিলেন। আব্দুর রশীদ লুলু স্থানীয় গুণী ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করে আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রইলেন।
‘আনোয়ারা’ প্রতি সংখ্যায় প্রাজ্ঞবচন উদ্ধৃত হয়। বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা মনীষীদের মূল্যবান উদ্ধৃতি সংকলন খুবই ভাল কাজ। লোকসংস্কৃতি, কৃষি, পরিবেশ, প্রকৃতি প্রভৃতি বিষয়কে ‘আনোয়ারা’ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ সম্পর্কিত নিবন্ধ ‘আনোয়ারা’ নিয়মিত প্রকাশ করে।
শত সংখ্যা প্রকাশের প্রত্যয় নিয়ে শিকড় সন্ধানী এ প্রকাশনার যাত্রা শুরু। ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্মৃতিচারণ, গল্প-কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ধর্ম, হোমিও, কৃষি, আলোচনা, সমালোচনা, প্রবাসী ব্যক্তিত্ব, সফল ব্যক্তিত্ব, নারী প্রকৃতি-পরিবেশ প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ প্রত্যয়দীপ্ত লেখা প্রকাশে আনোয়ারা আগ্রহী। সাময়িকীটির সাফল্য ও দীর্ঘ জীবন কাম্য।

 প্রফেসর নন্দলাল শর্মা: বিশিষ্ট লেখক-গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।

error: Content is protected !!