জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধন করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন দেশের অসংখ্য নাগরিক। কারও নামের বানানে ভুল, কারও জন্মতারিখে অসংগতি, আবার কারও পরিচয়পত্রে বাবা-মায়ের নামেও রয়েছে ভুল তথ্য। এসব সংশোধনের জন্য বারবার আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছেন না অনেকে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার এনআইডি সংশোধনের আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদনের মধ্যে এমন আবেদনও রয়েছে, যেগুলো একাধিকবার বাতিল হওয়ার পর পুনরায় জমা দেওয়া হয়েছে।
এনআইডিতে ভুল তথ্য থাকায় পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়ন, চিকিৎসা গ্রহণ এবং সন্তানের শিক্ষাগত সনদের সঙ্গে তথ্যের সামঞ্জস্য রক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। তবে নাম ও বয়সের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জালিয়াতি এবং অনিয়মের আশঙ্কা থাকায় আবেদন যাচাইয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সম্প্রতি নিজের এনআইডি সংশোধনের আবেদন বাতিল হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন ৭৬ বছর বয়সী উজ্জ্বল রানী সাহা। ২০১৭ সালে আবেদন করেও সংশোধন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত লাঠিতে ভর দিয়ে নির্বাচন ভবনে যেতে হয় তাঁকে।
উজ্জ্বল রানী সাহার অভিযোগ, তাঁর এনআইডিতে জন্মতারিখ, নিজের নাম এবং স্বামীর নামের বানানে ভুল রয়েছে। এসব ভুলের কারণে পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে পারেননি তিনি। ফলে ভারতে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করানো সম্ভব হয়নি। সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন শহিদুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, এনআইডিতে নিজের নামের পরিবর্তে লেখা হয়েছে মাকসুদুর রহমান। পাশাপাশি বাবা-মায়ের নামেও রয়েছে ভুল। ২০২৪ সালে সংশোধনের আবেদন করার পর তদন্তের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ দিলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। পরে চলতি বছরের জুনে তিনি নির্বাচন কমিশনের সচিবের কাছে আপিল করেন।
মনির হোসেনের অভিযোগ, তাঁর এনআইডিতে ফুফাতো ভাইয়ের নাম, পরিচয় ও বয়স যুক্ত হয়েছে। সংশোধনের জন্য পুরোনো ছবিযুক্ত পরিচয়পত্রের প্রমাণ চাওয়া হলে তিনি ১৯৯৭ সালে নেওয়া টিঅ্যান্ডটি ল্যান্ডফোন সংযোগের নথি সংগ্রহ করে জমা দিতে নির্বাচন ভবনে আসেন।
অন্যদিকে, শাকিল হোসেনের সংশোধনের আবেদন দুইবার বাতিল হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে সংশোধনের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও সমাধান পাননি তিনি।
এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (পরিচালনা) সাইফুল ইসলাম জানান, নির্বাচন কমিশনের মহাপরিচালকের এখতিয়ারভুক্ত ৬৯ হাজার ২৫২টি আবেদনসহ সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদনের বড় অংশই নাম ও বয়স সংশোধনসংক্রান্ত।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। বিশেষ করে পুরো নাম ও বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কারণ, এসব তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
এনআইডি মহাপরিচালক এইচ এম আনোয়ার পাশা জানান, প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। প্রতিটি আবেদন একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই করা হয়। এভাবে কার্যক্রম চলতে থাকলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
