টাকা থাকলেও কবরের জায়গা মিলছে না, ২০ বর্গফুটের জন্য সাড়ে ৪ কোটি টাকা

: অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2026-09-12
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর অভিজাত বনানী এলাকায় বসবাসের জন্য দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে যেখানে প্রায় ৫ কোটি টাকা লাগে, সেখানে মাত্র ২০ বর্গফুট জায়গার একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতেও গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ জীবনের শেষ ঠিকানার অল্প কিছু জায়গার মূল্যও এখন বড় একটি ফ্ল্যাটের কাছাকাছি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পরিচালিত বনানী কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরেই জায়গার সংকট চলছে। নতুন করে কবরের জায়গা তৈরির সুযোগও সীমিত। ফলে পুরনো কবর নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার করেই নতুন মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

কবরস্থান সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে একটি কবর ১৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ হয়। আর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে গেলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, স্থায়ী কবর পুনর্ব্যবহার করে নতুন করে দাফনের নির্ধারিত ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা।

বনানী কবরস্থানে প্রতিদিনই অনেকে কবরের জায়গার খোঁজে আসেন। কেউ স্বজনের জন্য আগাম জায়গা নিশ্চিত করতে চান, আবার কেউ নিজের মৃত্যুর পরের ঠিকানাটিও জীবদ্দশায় নিশ্চিত করে রাখতে চান। তবে জায়গার সংকটের কারণে অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও অনেককেই হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে।

বনশ্রী আবাসিক এলাকার ৬৫ বছর বয়সী শহিদুল আলম কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কবরস্থানে নিজের জন্য একটি জায়গা খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর আগে নিজের জন্য একটা কবরের জায়গা কিনে রাখতে চাই। ৪-৫ কোটি টাকা দিতেও রাজি ছিলাম। তার পরও সাড়ে তিন হাত জায়গা মিলছে না।’

বনানী কবরস্থানে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন কবরের জায়গা নেওয়ার জন্য আসেন। তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকলেও জায়গার অভাবে তাদের কোনো আশ্বাস দেওয়া সম্ভব হয় না।

কবরস্থানের মহরার হারুনুর রশীদ জানান, বর্তমানে বনানী কবরস্থানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। নতুন জায়গা না থাকায় পুরনো কবরই নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত দুই বছর পর একটি কবরের ওপর নতুন করে আরেকটি কবর দেওয়া হয়। এমনকি কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শুধু বনানী নয়, রাজধানীর অন্যতম পুরোনো ও বড় কবরস্থান আজিমপুরেও জায়গার সংকট প্রকট। প্রায় ৩২ একর আয়তনের এ কবরস্থানে কবর রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। প্রতিদিন সেখানে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফন হয়।

সাধারণত একটি মরদেহ প্রায় ১৮ মাস কবরে রাখার পর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই কবর পুনর্ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও জায়গার সংকটের কারণে হাজার হাজার আবেদন জমে আছে বলে জানান কবরস্থানের মহরার রবিউল ইসলাম।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকার জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও কবরস্থানের পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। রাজধানীর নগর পরিকল্পনায় আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো বিভিন্ন নাগরিক সেবার জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হলেও ভবিষ্যতে কবরস্থানের প্রয়োজন কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, কবরস্থানও গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরসেবা। কিন্তু ঢাকার বিস্তারের সঙ্গে মানুষের আবেগ ও প্রয়োজনের এই জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাঁর মতে, জায়গার সংকটের কারণেই কবর সংরক্ষণের জন্য এত উচ্চ ফি নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কবরস্থানকে কমিউনিটি স্পেস হিসেবেও ব্যবহারের নজির রয়েছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করা জরুরি। আগামী ২০ বছরে রাজধানীতে দাফনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

তিনি জানান, বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য এক একর কবরস্থান প্রয়োজন। সেই হিসাবে ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি হলে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থানের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া ড্যাপেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট আকারের কবরস্থান নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

error: Content is protected !!