নীরবে লিভার নষ্ট করে হেপাটাইটিস, সচেতনতাই হতে পারে সুরক্ষার পথ

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: 2026-07-28
ছবি : সংগৃহীত

অনেক মানুষই প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন, কাজ করছেন, অথচ শরীরে বাসা বাঁধা হেপাটাইটিস ভাইরাস সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই ধীরে ধীরে লিভারের ক্ষতি করতে পারে এই ভাইরাস। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে একপর্যায়ে তা লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া এমনকি ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এ কারণেই ভাইরাল হেপাটাইটিসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।

আজ ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘হেপাটাইটিস: আসুন, বাধা ভেঙে এগিয়ে যাই’ (Hepatitis: Let’s Break It Down)। এর মূল লক্ষ্য হলো ভয়, কুসংস্কার, বৈষম্য ও চিকিৎসার পথে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করে মানুষকে হেপাটাইটিস শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত। উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই জানেন না যে তারা এই ভাইরাস বহন করছেন। ফলে কোনো উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে তাদের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হেপাটাইটিস কী

হেপাটাইটিস মূলত লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়। বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের কারণে এ রোগ হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান পাঁচটি হলো—হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই।

হেপাটাইটিস বি ও সি তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন চিকিৎসার বাইরে থাকলে এসব ভাইরাসের সংক্রমণ লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল হওয়া এবং লিভার ক্যানসারের মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।

যেভাবে সংক্রমণ ছড়ায়

হেপাটাইটিস বি ও সি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, দূষিত সিরিঞ্জ, অপরিষ্কার চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শরীরের নির্দিষ্ট কিছু তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অন্যদিকে, হেপাটাইটিস এ ও ই মূলত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।

তবে হেপাটাইটিস আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দন, একইসঙ্গে খাবার খাওয়া, কোলাকুলি করা কিংবা একই বাড়িতে বসবাসের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না।

সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সতর্কতা মেনে চললে হেপাটাইটিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য—

  • হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিতে হবে।
  • প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে শরীরে সংক্রমণ আছে কি না নিশ্চিত হতে হবে।
  • সিরিঞ্জ, সুই ও ব্লেড ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন অথবা জীবাণুমুক্ত উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • রেজার, টুথব্রাশ ও নেইল কাটারের মতো ব্যক্তিগত সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে না।
  • নিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
  • খাবার ও পানির ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

গর্ভবতী মায়েদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি

হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে সন্তান জন্মের সময় নবজাতকের শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব, বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে অতিরিক্ত ওষুধ দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে।

চিকিৎসায় আশার আলো

হেপাটাইটিস সি-এর চিকিৎসায় বর্তমানে কার্যকর ওষুধ রয়েছে। সঠিক চিকিৎসায় অধিকাংশ রোগীই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস বি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার ফলাফল তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ঝুঁকি থাকলে দেরি না করে পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

২০৩০ সালের লক্ষ্য

ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকি হিসেবে না রাখার লক্ষ্য নিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

হেপাটাইটিস অনেক সময় নীরবে শরীরে ক্ষতি করে। তবে সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

error: Content is protected !!