মেঘের কোলে রোদ হেসেছে

: আব্দুর রশীদ লুলু
প্রকাশ: 2026-08-15

দুপুরে অসহ্য গরমে ঘুম ভেঙে যায়। ঈশ্, কী ঝাঁঝালো রোদ! বৈশাখের প্রথম দিনে বিশ্ব প্রকৃতি যেন উত্তপ্ত সূর্যটাকে নিয়ে এক তান্ডব লীলায় মেতে ওঠেছে। হাত-পাখাটা ঘোরাতে ঘোরাতে মুনার স্মৃতি মূর্ত হয়ে ওঠে। মুনা! সহপাঠিনী মুনা, আমাকে কেন্দ্র করে সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করে। ক্লাশে এমন স্থানে বসে যাতে সহজেই আঁখি মিলন ঘটে। এছাড়া প্রায়ই লাইব্রেরিতে ওর সাথে দেখা হয়। বিচিত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে ওর আগ্রহ প্রচুর। যা আমারও প্রিয়। আর ওর মার্জিত আচার-আচরণ আমাকে প্রায় উন্মাদ করে তুলে।
বেশ ক’দিন হয় অনিন্দ্য সুন্দরী মুনার সাথে দেখা নেই। ডিগ্রী পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাবার ইচ্ছানুযায়ী বাড়িতে চলে আসি। বাড়িতে এসে যত্রতত্র ঘোরা-ফেরা এবং শুয়ে-বসে বাইরের ঘরের চৌকিটা ভাঙা ব্যতিত খেয়ে-দেয়ে কোন কাজ-কর্মই আমার নেই।
বাবা একটা চাটাই বিছিয়ে বারান্দায় বসে আছেন। জীবন যন্ত্রণায় অতীষ্ট বাবার মুখে এই বৈশাখের রোদেলা দুপুরেও একটা প্রশান্তির ভাব। একটু আগে ক্ষেত ঘুরে এসেছেন। একমাত্র ফসল বোরো ধান এবার ভালো হয়েছে। বাবা তাই যখন তখন ক্ষেতের কথায় সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি একটু স্বস্তি অনুভব করি। এবার নিশ্চয় বাবা একটু চিন্তামুক্ত হবেন এবং একটুকুতেই ভাই-বোন গুলোকে গালাগালি করা থেকে বিরত থাকবেন।
বাবারই বা দোষ কী! গত ক’টা বছর একটানা বিভিন্নভাবে ক্ষেত নষ্ট হলো। অথচ একমাত্র বোরো ক্ষেতের ওপর সারাটা পরিবারের ভরণ-পোষণ এবং আমার লেখা-পড়ার খরচ সবই নির্ভরশীল। এমনি করে অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে গেলো। সাথে সাথে মধুর স্বভাব ও উচ্চ আকাঙ্খা সম্পন্ন মানুষ বাবাও বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ হয়ে গেলেন। সারাক্ষণ খিটখিট করেন, চড়া মেজাজে থাকেন। না হয়েই বা উপায় কি, এক গাঁদা ঋণের সাথে সাথে ঘরে দুটি সোমত্ত বোন। এদের যখন-তখন বিয়ে দেয়া দরকার। কিন্তু বাবার সামর্থ্য নেই।
এবার অন্তত: একটাকে পার করা যাবে। মনে মনে আমি তাই আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই- আল্লাহ তোমার মহিমার শেষ নেই।
ইতোমধ্যে দক্ষিণ আকাশ জুড়ে বিরাটকায় মেঘ জমে। বাবা যেন আঁৎকে ওঠেন। ছোট ভাইটা ছুটে হাওর থেকে গরু-বাছুর আনতে। আমি মুখ ধুঁতে পুকুরে যাই। কিন্তু ততক্ষণে শোঁ শোঁ করে দূরন্ত কাল-বৈশাখী বইতে শুরু করে। দৌড়ে ঘরে আসতে না আসতে আমার ঘরের টিনের চালাটা উড়ে যায়। মিনিট কয়েক যেতে না যেতেই ঝড়-বৃষ্টির সাথে সাথে প্রবলভাবে শিলা বৃষ্টি আরম্ভ হয়। বাবার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। চতুর্দিকে আহাজারির রব ওঠে- আল্লাহ, বাঁচাও! বাঁচাও!!
কাল-বৈশাখী থামতে না থামতেই চতুর্দিক থেকে হাঁক-ডাক শুরু হয়। এর ঘর ভেঙ্গেছে, ওর চাল গিয়েছে। চারদিকটা লন্ড-ভন্ড হয়ে পড়েছে। সাথে সাথে এতদ্ঞ্চলের মানুষের একমাত্র বাঁচার অবলম্বন অনেক আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন বোরো ধান নি:শেষ হয়ে গিয়েছে।
সবাই হণ্যে হয়ে ছুটছে। বাবা মাথায় হাত দিয়ে ধ্বপাস করে মাটিতে বসে পড়েন। মা-ভাই-বোন সবার মুখে একরাশ বিষাদের রেণু। আমি তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু মুখ দিয়ে রা বেরোয় না। কি করব কি বলব ভেবে ওঠতে পারি না।
এমনি দুরবস্থায় চোখের সামনে উচ্চবিত্তের মেয়ে মুনার ছবি ভেসে ওঠে। সাথে সাথে মুনার কণ্ঠ যেন নূতন করে ঝংকার তুলে- কাওসার, তুমি লেখা-পড়ায় যেমনি জুয়েল, তেমনি কথা-বার্তায় আর দৈহিক সৌন্দর্যে। সত্যি, তুমি অতুলনীয়।
যদিও মুনা আমাকে অতুলনীয় বলে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ওর তুলনা হয় না। আচার-আচরণে আর মেধায় সে অতুলনীয়। শহরে বেড়ে ওঠলেও যার শিকড় গ্রামে প্রোথিত। গ্রাম যার ভালোলাগায় বিরাজিত, যা আমার বহু কাঙ্খিত। ওকে বধু করে ঘরে তোলার স্বপ্ন তাই অন্তরে গুমরে মরে। ভাবছিলাম ভালোয় ভালোয় বোন দু’টিকে পার করতে পারলে মাকে কানে কানে মুনার কথাটা বলব।
চুলোয় যাক মুনা। স্বচোখে এমন বিপর্যয় দেখেও আমি নিশ্চুপ বসে থাকতে পারি না। জীবনে আমার বাঁচাটাই এখন কঠিন আর কঠিন বিধায় এবার আমাকে জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পরিবারের বড় সন্তান হিসাবে মা-বাবা, ভাই-বোনকে বাঁচাতে হবে। এত দিন ওরা স্বপ্ন দেখেছে, পড়ালেখা শেষে আমি চাকুরী করব; সবার মুখে হাসি ফুটাবো। কিন্তু স্বপ্ন সে তো অনেক দূর। না আর স্বপ্ন নয়। এবার বাস্তব এবং কঠিন বাস্তব।
মুনাকে চুলোয় দিয়ে আমি ভাবতে থাকি। ভাবতে থাকি বর্তমানকে নিয়ে। ডিগ্রী পরীক্ষার রিজাল্ট কবে হবে? চাকুরীর জন্য কত দরখাস্ত লিখতে হবে? কত ঘুরতে হবে? কত ইন্টারভিউ দিতে হবে? এসবে কত টাকা লাগবে? ততোদিনে পরিবারের কি অবস্থা হবে? বাবা কি করবেন?
ভাবতে ভাবতে একটা সহজ পথ পেয়ে যাই। লাফ দিয়ে উঠি: ইউরেকা!
কাছে বসা ছোট বোন শাহেদা আমার আকস্মিক এ আচরণে অবাক হয়। আমি তার দিকে চেয়ে মিটি মিটি হাসি।
ঃ ভাইয়া, শিলাবৃষ্টি আর কাল-বৈশাখীর পর সবাই কাঁদছে। আর তুমি হাসছো!
ঃ কারণ আছে। বুঝলে- সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে। তোদের বিয়ে হবে। তারপর ঘরে মুনা আসবে। সময়-সুযোগে আমার উচ্চ শিক্ষা সম্পন্ন হবে….।
শাহেদা আমার কথার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারে না। আমি তাকে কাছে ডেকে ফিসফিসিয়ে বলি- আর বাইরের ঘরে শুয়ে শুয়ে চৌকি ভাঙ্গা না। বুঝলে কালই যাবো যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ নিতে। তারপর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বহুমুখী কৃষি খামার করব। হাঁস-মোরগ, গরু-ছাগল, মাছ, গাছ-পালা, শাক-সবজি, ফল-মূল- সব সব। একবার শিলাবৃষ্টি বোরো ধান নিয়েছে তো কি হয়েছে? কৃষির আরো কত কিছু পড়ে আছে। মনে মনে আক্ষেপ করি, কৃষিতে এক ফসলের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ- এ কথাটা আরো আগে আমার ভাবনায় আসা উচিৎ ছিল। গ্রামের শিক্ষিত ছেলে হিসেবে বিষয়টা আরো আগেই সবাইকে বুঝিয়ে বলা আমার দায়িত্ব ছিল।
এস.এস.সি পাশ বুদ্ধিমতি বোনটা সহজেই বুঝে ফেলে। তারপর সেও মিষ্টি হাসে। হেসে প্রশ্ন রাখে- কিন্তু মুনাটা কে ভাইয়া, বুঝলাম না।
ঃ বুঝবে বুঝবে। সময় হলে বুঝবে। কিন্তু তোদের সবাইকে কাজ করতে হবে আমার বহুমুখী কৃষি খামারে।
তারপর হাসি মুখে শাহেদার পিঠে আস্তে করে একটা থাপ্পর দিয়ে বাবার কাছে বসি। বাবাকে সান্তনা দেয়া দরকার। মনে মনে বলি- বাবা, এবার তোমার অবসর। এবার তুমি শুধুই আমার উপদেষ্টা। ১৬ মে ২০০৫

লেখক: সম্পাদক- আনোয়ারা (শিকড়সন্ধানী প্রকাশনা), আনোয়ারা হোমিও হল, আনোয়ারা কমপ্লেক্স-লুলু সেন্টার, দেওয়ান বাজার, গহরপুর, বালাগঞ্জ, সিলেট। মোবাইল- ০১৭২৮-০৭৩৮৫২

সাহিত্য এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন:
error: Content is protected !!