ছবি: সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) একের পর এক আবেদন ও অভিযোগ জমা পড়ছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার ভোটারদের পক্ষ থেকে প্রায় ২০০টি আবেদন এসেছে। এসব আবেদনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পাঠাগারকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণের বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।
এ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও আগামী জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে কোথাও পুরোনো ভোটকেন্দ্র ফিরিয়ে আনা, কোথাও নতুন নির্ধারিত কেন্দ্র পরিবর্তন এবং কোথাও নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ভোটকেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ভোটকেন্দ্র পরিবর্তনের আবেদনে মূলত ভোটারদের যাতায়াতের সুবিধা, কেন্দ্রের ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক, নারী, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ভোটারদের কেন্দ্রে যাতায়াতের বিষয়টিও একাধিক আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে ভোটকেন্দ্র সংক্রান্ত আবেদন আসছে। যৌক্তিকতা থাকলে সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। ২০২২ সালের সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনসহ এর আগের নির্বাচনগুলোতে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এবার ওই কেন্দ্র সরিয়ে ধ্রুবতারা পাঠাগারকে ভোটকেন্দ্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরে আরেক আবেদনে পাঠাগারের পরিবর্তে ইউছুফ আলী তা’লীমুল কোরআন ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানানো হয়।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, বর্তমানে নির্ধারিত কেন্দ্রটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং একটি চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে হওয়ায় নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়া পাঠাগারটির অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয় বলে তারা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারী মো. শাহ আজিম বলেন, নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না—এমন তথ্য জানানো হয়েছে। এ কারণেই কেন্দ্র পরিবর্তন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পাঠাগারটি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং সেখানে মাত্র একটি দরজা রয়েছে। ভোটারদের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই সেখানে কীভাবে ভোটগ্রহণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে তারা বিকল্প কেন্দ্রের প্রস্তাব দিয়েছেন। আগের মতো ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে কেন্দ্র করা হলেও তাদের আপত্তি নেই।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা রাজাপুর ফাজিল মাদ্রাসাকে পুনরায় ভোটকেন্দ্র করার আবেদন করেছেন। তাদের দাবি, পাঁচটি গ্রামের মাঝামাঝি অবস্থিত মাদ্রাসাটি ভোটারদের জন্য সহজে যাতায়াতযোগ্য এবং সেখানে ভোটগ্রহণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান কয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি ইউনিয়নের প্রান্তে এবং কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ির কাছে হওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা আবেদনে বলা হয়েছে।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররাও কেন্দ্র পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। তাদের ভাষ্য, পাঁচ গ্রামের মধ্যে চার গ্রামের ভোটারকে বর্তমান কেন্দ্রে যেতে প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার হাঁটতে হয়। তাই চার গ্রামের মাঝামাঝি থাকা হাজী জয়নাল চাকলাদার কাশেমুল উলুম রহমানিয়া মাদ্রাসায় ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আংগারপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা পূর্ব ছাতিয়ানগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বদলে ছাতিয়ানগড়-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র করার আবেদন করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান কেন্দ্রটি অধিকাংশ ভোটারের জন্য দূরে এবং যোগাযোগব্যবস্থাও সুবিধাজনক নয়। এতে বয়স্ক, নারী, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ভোটারদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে।
গাইবান্ধার বোনারপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে নারী ও পুরুষ ভোটারদের জন্য পৃথক কেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়েও আপত্তি এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি বর্তমান কেন্দ্র থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এবং ইউনিয়ন সীমানার কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে ভোটার উপস্থিতি কমতে পারে।
ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরখলিফা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা পুরোনো কেন্দ্র পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ৩০ নম্বর চরদিদারুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় সেখানে সহজে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু বর্তমানে নির্ধারিত কেন্দ্রটি প্রধান সড়ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে হওয়ায় বয়স্ক, নারী, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ভোটারদের বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে নারী ভোটারদের জন্য পৃথক কেন্দ্র করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আবেদন করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যনগর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষ উভয় ভোটার ভোট দিয়ে আসছেন। নতুন কেন্দ্রটি যাতায়াতের দিক থেকে অসুবিধাজনক এবং সেখানে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সড়কও নেই। তাই আগের কেন্দ্রেই নারী-পুরুষ উভয়ের ভোটের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামালদিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা পাঁচই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে ৯৬নং সৈয়দা সাফিয়া জাফর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের আবেদন করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান কেন্দ্রের আওতায় ৭৯৭ জন ভোটার রয়েছেন। বিপরীতে প্রস্তাবিত কেন্দ্রের আশপাশে ভোটার সংখ্যা ৯৪০। বেশি ভোটারের সুবিধা বিবেচনায় কেন্দ্র পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে গত ১০ সেপ্টেম্বর মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। এরপর থেকেই ইসিতে বিভিন্ন আবেদন আসতে শুরু করে। এসব আবেদনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছে কমিশন।
আবেদনগুলো নিষ্পত্তির পর সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনের ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করবে ইসি।
সম্ভাব্য চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৫ হাজার ১৫১টি, ভোটকক্ষ ২৫ হাজার ৬৫টি এবং অতিরিক্ত গোপন কক্ষ ১৪ হাজার ২৬২টি।
৫০০ উপজেলায় ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪১ হাজার ৪৬৬টি, ভোটকক্ষ ২ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৫টি এবং অতিরিক্ত গোপন কক্ষ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৬টি।
৩২৬টি পৌরসভায় সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র ৫ হাজার ১৮৪টি, ভোটকক্ষ ২৫ হাজার ৯৬৬টি এবং অতিরিক্ত গোপন কক্ষ ১৬ হাজার ১৬৫টি।
এ ছাড়া ৪ হাজার ৫৭৩টি ইউনিয়ন পরিষদে সম্ভাব্য চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্র ৪৬ হাজার ৩৯৭টি। এসব কেন্দ্রে ভোটকক্ষ ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯টি এবং অতিরিক্ত গোপন ভোটকক্ষ ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৪টি।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশে ভোটকেন্দ্র ছিল ৪২ হাজার ৭৬১টি এবং ভোটকক্ষ ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি।
ইসির সর্বসাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৬৭ জন।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এসব ভোটারই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দেবেন।
এর আগে গত ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি পাঠিয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন, শপথ গ্রহণ, প্রথম সভা ও মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ জানতে চায় ইসি।
একই সঙ্গে সীমানা বা ওয়ার্ড বিন্যাস নিয়ে কোনো মামলা আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচন উপযোগী কি না, তাও জানাতে বলা হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জুলাই পৌরসভা এবং ২ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা ইসিতে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
