হাসিনার পতনের পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা: নিজেরাই নিজেদের গ্রাস করছে

: লেখা: আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশ: ২০২৫-১১-২০

হাসিনা সরকারের পতনের পর বহু মানুষ ভেবেছিল বিএনপি স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে উঠে দাঁড়াবে—সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব হিসেবে।
কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো।

বিএনপি এখন নিজের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকটে ডুবে আছে—দলীয় কোন্দল, সমান্তরাল নেতৃত্ব, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, এবং কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে পরিণত হওয়া অভ্যন্তরীণ সহিংসতা।

ভয়াবহ সংখ্যা: বিএনপির ভেতরেই এত মৃত্যু

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরে ঘটেছে—

২৯১টি সংঘর্ষ

৬৩ জন নিহত

৩,৩৫২ জন আহতএই হত্যাগুলো আওয়ামী লীগ বা পুলিশ করেনি—
বিএনপি কর্মীরাই অন্য বিএনপি কর্মীকে হত্যা করেছে।

দৈনিক স্টারের আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৪-এর পরের সাত মাসে ৪৩ জন বিএনপি কর্মী অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন।
অন্য একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আট মাসে ৫১ জন নিহত হয়েছিলেন।

সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য থাকলেও সত্য একটাই—
বাংলাদেশের কোনো বড় রাজনৈতিক দলের ভেতরে এমন ভয়াবহ সহিংসতার নজির সাম্প্রতিক কালে নেই।

সাম্প্রতিক ঘটনা: সহিংসতা থামেনি, বরং বাড়ছে

২০২৫ সালের শেষ দিকেও অভ্যন্তরীণ সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

৩ নভেম্বর ২০২৫ – মুন্সীগঞ্জ সদর

স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন
আরিফ মীর, আহত হন আরও একজন।

৩ নভেম্বর ২০২৫ – ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর)

মনোনয়ন বঞ্চিত একজন নেতার সমর্থকরা মনোনীত প্রার্থীর পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এই সংঘর্ষে ছাত্রনেতা তানজিম আহমেদ আবিদ মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
আরও পাঁচজন গুরুতর আহত হন। পরে বিএনপি পাঁচজন স্থানীয় নেতাকে বহিষ্কার করে।

২০২৫ সালের মাঝামাঝি – বিভিন্ন জেলা

প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে—আট মাসে ৫১ জন বিএনপি নেতা-কর্মী
নিজেদের অভ্যন্তরীণ দলে “দখল, প্রভাব, ব্যবসা, আধিপত্য” ইস্যুতে খুন হন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে দলটি পুরোপুরি শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সংকটে ভুগছে।

 

নেতৃত্বহীনতা দলটিকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে

বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামো এখন বিচ্ছিন্ন, দুর্বল এবং প্রায় অকার্যকর।
অনেক তৃণমূল কর্মী জানেন না—
কে প্রকৃত নেতা, কোন কমিটি বৈধ, কার নির্দেশ মানা উচিত।

এর ফল—

স্থানীয় “সিন্ডিকেট” বা গ্রুপ তৈরি

মনোনয়ন নিয়ে গোষ্ঠী-সংঘর্ষ

ব্যক্তিগত রেষারেষি খুনে পরিণত হওয়া

সমান্তরাল কমিটির দ্বন্দ্ব

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য

একটি রাজনৈতিক দল যদি নিজের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে দেশ পরিচালনা তো দূরের কথা।

এতে বিএনপির নৈতিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

বহু বছর ধরে বিএনপি নিজেদেরকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার দল হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
এ দাবির পেছনে বাস্তবতা আছে।

কিন্তু যখন বিএনপি কর্মী নিজেরাই বিএনপি কর্মীকে হত্যা করে—
তখন দলের নৈতিক অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

জন্মায় কঠিন প্রশ্ন—

যারা নিজেদের দলে শান্তি রাখতে পারে না, তারা দেশকে কীভাবে শান্তি দেবে?

যারা অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে হিংসা বেছে নেয়, তারা গণতন্ত্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা করবে?

যাদের কর্মীরা নিজেদের দলের লোকের ভয়ে থাকে, জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখবে কিভাবে?

 

এটি শুধু দলের সংকট নয়—জাতীয় সংকট

একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন।
বিএনপি যদি নিজের সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় ভেঙে পড়ে,
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

একটি প্রধান বিরোধী দলের পতন মানে গণতন্ত্রেরই পতন।

বিএনপির করণীয়: আগে নিজের ঘর ঠিক করতে হবে

ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে বিএনপিকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে—

1. স্পষ্ট, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব গঠন

2. সমান্তরাল কমিটি বন্ধ করে স্বচ্ছ অভ্যন্তরীণ নির্বাচন

3. অভ্যন্তরীণ সহিংসতার প্রতি শূন্য সহনশীলতা

4. কর্মীদের রাজনৈতিক-আদর্শিক প্রশিক্ষণ জোরদার

5. তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ ও আস্থা পুনর্গঠন

বিএনপি আজ একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—দলটি কি নিজেদের ভেতরের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতাকে পরাজিত করতে পারবে?

যদি না পারে, তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হারানোর আগেই
নিজেদের ভেতরেই নিজেরা পরাজিত হয়ে যাবে।

*আব্দুল্লাহ আল মামুন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও সাংবাদিক।

error: Content is protected !!