সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী তালতলা গ্রামের কৃতি সন্তান, প্রবাসী সমাজকর্মী, শিক্ষানুরাগী ও মানবতাবাদী লেখক ফজির আহমেদ আশরাফের জন্মদিন আজ। ১৯৬৬ সালের ১৬ মে তিনি এক সম্ভ্রান্ত ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মো. নিম্বর আলী এবং মাতা মরহুমা মরতুজা খাতুন ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, সৎ ও মানবিক গুণাবলির অধিকারী। পারিবারিক সেই আদর্শিক পরিবেশই তাঁর ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, মেধাবী ও সংস্কৃতিমনা। ছাত্রজীবনে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। বই পড়া, কবিতা লেখা এবং সমাজ-বাস্তবতা নিয়ে ভাবনা ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সময়ের পরিক্রমায় সেই আগ্রহই তাঁকে একজন সংবেদনশীল লেখক হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
বর্তমানে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা প্রবাসী। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, পরিবার ও কর্মজীবনের নানা দায়িত্বের মধ্যেও তিনি কখনো ভুলে যাননি তাঁর জন্মভূমি, শেকড় ও দেশের মানুষের কথা। হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানুষের সুখ-দুঃখ সবসময় তাঁর হৃদয়কে স্পর্শ করে। বিশেষ করে নিজের এলাকা বালাগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের প্রতি তাঁর রয়েছে গভীর আবেগ ও আন্তরিকতা।
ফজির আহমেদ আশরাফ মূলত পদ্য লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর লেখার ভাষা সহজ, সাবলীল ও হৃদয়ছোঁয়া। জটিল শব্দচয়ন নয়, বরং সাধারণ মানুষের ভাষায় তিনি জীবনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। ফলে তাঁর লেখাগুলো পাঠকের হৃদয়ে সহজেই নাড়া দেয়। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমাজের বাস্তব চিত্র, মানুষের জীবনসংগ্রাম, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “তবুও মনে পড়ে এবং বাবার মহৎ জীবন”। এই গ্রন্থে স্মৃতিচারণ, পারিবারিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনবোধ অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিকতার যে বার্তা তিনি তুলে ধরেছেন, তা পাঠকমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
স্বদেশপ্রেমিক এই লেখকের সাহিত্যচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নন। তাঁর লেখায় দেশের নানা সমস্যা, অবক্ষয়, দারিদ্র্য, শিক্ষার সংকট ও মানবিক দুরবস্থার চিত্র উঠে আসে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে। তবে তিনি শুধু সমস্যার চিত্রই তুলে ধরেন না; বরং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন, ইতিবাচক চিন্তা এবং উত্তরণের পথও দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেই একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ অত্যন্ত গভীর। তিনি মানবতাকেই সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে মনে করেন। তাঁর লেখায় তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবকল্যাণ এবং বিশ্বমানবতার আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে ভাবায়। শিক্ষিত, সচেতন ও কর্মমুখী সমাজ গঠনের প্রত্যাশা তাঁর প্রায় প্রতিটি লেখার অন্তর্নিহিত বার্তা।
শিক্ষা ও শিক্ষক সমাজের প্রতিও তাঁর অনুরাগ অত্যন্ত প্রবল। তিনি মনে করেন, একজন আদর্শ শিক্ষকই পারে একটি জাতিকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে। তাই প্রবাসে থেকেও তিনি শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক উন্নয়ন ও মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে আমেরিকায় সুখী ও সুন্দর জীবনযাপন করলেও স্বদেশের যেকোনো দুর্যোগ, সংকট কিংবা মানুষের কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করে। দেশের প্রতি এই গভীর মমত্ববোধই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাঁর সাহিত্যচর্চা শুধু সৃজনশীলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি মানবতা, দেশপ্রেম ও সমাজসেবার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
আলাপকালে ফজির আহমেদ আশরাফ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, জন্মদিন নিয়ে আমি খুব বেশি উৎসাহিত নই। মহান আল্লাহ আমাকে যে নিয়ামত, সুযোগ ও দায়িত্ব দিয়েছেন, তার কতটুকু যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি—সেই চিন্তাই আমাকে বেশি ভাবায়। মানুষের জন্য কতটুকু কল্যাণকর কাজ করতে পেরেছি, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আজ এই গুণী লেখক, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগীর জন্মদিনে শুভাকাঙ্ক্ষী, পাঠক ও এলাকাবাসী তাঁকে জানাচ্ছেন আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। সকলের প্রত্যাশা—তিনি সুস্থ, সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন লাভ করুন এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম ও মানবিক চিন্তাধারা আগামী প্রজন্মকে আলোকিত ও অনুপ্রাণিত করে যাক।
