রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপদ্ধতি, সংসদের দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী রোববার আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, এসব বিষয়ের ওপর সংবিধান সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলোর সঙ্গে বিএনপির মত পার্থক্য রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে অনেকটাই একমত।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া আলোচনা চলে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত, মধ্যবর্তী এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে। এটি ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা চতুর্থ দিন। বিটিভি নিউজ সরাসরি অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করে।
আলোচনায় আগের অসমাপ্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ’ ও ‘রাষ্ট্রের মূলনীতি’ বিষয়েও কথা হয়। তবে আগের আলোচনা সম্পূর্ণ না হওয়ায় এবং রাষ্ট্রের মূলনীতি আলোচনায় না উঠায় এ দুটি বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
সকালবেলা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা মুলতবি রেখে সংসদের দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। উচ্চকক্ষে ১০০টি আসনের প্রস্তাব নিয়ে একটি প্রাথমিক ঐকমত্য গড়ে উঠলেও এর নির্বাচনপদ্ধতি নির্ধারণে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
বর্তমানে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি ইলেকটোরাল কলেজের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে।
এ নিয়ে নানা মত উঠে আসে—কেউ পক্ষে আবার কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এতে ভোট কেনাবেচা ও ভোটার আটকে রাখার ঝুঁকি থাকবে। কেউ সরাসরি ভোটের পক্ষে মত দেন, কেউ গোপন ব্যালটে ভোটের প্রস্তাব তোলেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দলের অবস্থান বিদ্যমান পদ্ধতির পক্ষে। তিনি বলেন, গোপন ব্যালটের দরকার নেই, কারণ ৭০ অনুচ্ছেদে সংশোধন এলে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। তবে বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আলোচনার একপর্যায়ে কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ জানান, অধিকাংশ দল বর্তমান পদ্ধতির পরিবর্তনে সম্মত। সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার দিকে সবাই কিছুটা একমত।
তবে জামায়াতের নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, গোপন ব্যালট দিলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তই অনুসরণ করবেন, ফলে প্রকৃত অর্থে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
সংবিধান সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের প্রস্তাব দেয়। অর্থাৎ, দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, তার ভিত্তিতে আসন পাবে। কিন্তু বিএনপি এ ব্যবস্থার বিরোধিতা করে। তারা বলে, নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বরাদ্দ দিতে হবে।
বিএনপির বক্তব্য, এই পদ্ধতিতে কোনো দলই সহজে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না, ফলে সংবিধান সংশোধন কিংবা সাধারণ বিল পাস করাও কঠিন হয়ে যাবে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন অবশ্য আনুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান নেয়। এনসিপি মত দেয়, প্রার্থী তালিকা নির্বাচনের আগেই প্রকাশ করতে হবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের একটি প্রস্তাব হলো, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। বিএনপি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও বেশ কয়েকটি দল এই সীমাবদ্ধতার পক্ষে। কেউ কেউ এমনও মত দেয় যে, পরপর দুবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিরতি দিয়ে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রিত্বের সুযোগ রাখা যেতে পারে। এ নিয়েও গতকাল আলোচনা হলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
বৈঠক শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও, অধিকাংশ দল বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। তবে এই সিদ্ধান্ত দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। এজন্য উচ্চকক্ষ নিয়ে আলোচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আলোচনায় অংশ নেন কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি এমদাদুল হক, সফর রাজ হোসেন, ইফতেখারুজ্জামান ও মো. আইয়ুব মিয়া। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার।
