৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১২ আইপিপির সঙ্গে চুক্তি, কমছে উৎপাদন ব্যয়

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৬-০৫-২১
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় গ্রিডে আরও ৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করতে ১২টি বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। এসব প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের গড় ব্যয় প্রতি ইউনিটে (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৮০ সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ টাকা ১২ পয়সা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি আগের তুলনায় প্রায় আড়াই সেন্ট কম।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের জ্বালানি বহুমুখীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন চুক্তির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ ইউনিটপ্রতি ২ থেকে ৩ সেন্ট পর্যন্ত কমে আসবে। আগে যেখানে উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৫ সেন্ট, সেখানে নতুন প্রকল্পগুলো ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল হওয়া ছয়টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পুনরায় চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে নতুন আরও ছয়টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

এর মধ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াটের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। পাবনার ঈশ্বরদীতেও গড়ে তোলা হবে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র।

এছাড়া কক্সবাজারে দুটি ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে বাগেরহাটের মোংলায় আরও একটি ১০০ মেগাওয়াট এবং পাবনার ঈশ্বরদীতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

অন্য প্রকল্পগুলো স্থাপন করা হবে মৌলভীবাজারের সদর ও বিবিয়ানা, নীলফামারীর জলঢাকা, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং নোয়াখালীর সুধারামে। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১০ থেকে ৫০ মেগাওয়াটের মধ্যে।

বিপিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ট্যারিফ নিশ্চিত করেই এসব আইপিপির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে কনফিডেন্স পাওয়ারের চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানিয়েছেন, তাদের তিনটি প্রতিষ্ঠান মোট ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি দুটি প্রকল্পের জন্য জমি কেনার কাজ চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এসব সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত রয়েছে এবং ৩৭৭ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট অফ-গ্রিড ব্যবস্থায় উৎপাদিত হচ্ছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৩ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াটে। এর মধ্যে রয়েছে ২৩০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ, ৬২ মেগাওয়াট বায়ুশক্তি, ০.৬৯ মেগাওয়াট বায়োগ্যাস এবং ০.৪ মেগাওয়াট বায়োমাস বিদ্যুৎ।

জ্বালানি বিশ্লেষক ও ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর কর্মকর্তা শফিকুল আলম বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।

অন্যদিকে কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন)-এর প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি বলেন, মানুষকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা গেলে সরকারি বিনিয়োগের চাপ কমবে। তিনি আরও জানান, আগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১৩ হাজার একর অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা হলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ২৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (আইআরইএনএ)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটির উৎপাদন সক্ষমতা ১২ লাখ ২ হাজার ১৭৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তৃতীয় স্থানে ভারত।

এদিকে জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ সংযুক্তির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম বর্তমানে ৮ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, ফিলিপাইন ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, শ্রীলঙ্কা ১ হাজার মেগাওয়াট এবং পাকিস্তান ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

error: Content is protected !!