ছবি : সংগৃহীত
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হতে পারে। তবে সংশোধিত বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে। ফলে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন হবে দুই ধাপে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি চলতি সপ্তাহের মধ্যেই নবম পে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেলে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ বিষয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে।
প্রাথমিকভাবে সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেছিল। একটি ছিল তিন ধাপে বাস্তবায়ন, যেখানে প্রথম বছরে নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরের বছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং এরপরের অর্থবছরে সংশোধিত ভাতা কার্যকরের প্রস্তাব ছিল।
তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই ধাপে মূল বেতন কার্যকর করলে সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবিএএস++ (Integrated Budget and Accounting System)-এ কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর হলেও প্রত্যাশিত বেতন বৃদ্ধি হতো না, এমনকি কারও কারও মোট বেতন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল্যায়ন কমিটি একবারেই নতুন স্কেলের সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করেছে। সেই অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে এবং পরবর্তী অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন ভাতা চালু করা হবে।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ বা তার কিছুটা কম বাড়তে পারে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই হার নবম পে কমিশনের মূল সুপারিশের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নতুন বেতনকাঠামোর প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেট বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা হবে।
নবম পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারেই পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। তবে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকরের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি, ঋণ গ্রহণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম বছরে সংশোধিত মূল বেতন এবং পরের বছরে সংশোধিত ভাতা কার্যকর করা হয়। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকার বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।
