ছবি : সংগৃহীত
পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের আইনে এটি একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ‘পিতা’ বলতে সন্তানের জনক এবং ‘মাতা’ বলতে সন্তানের গর্ভধারিণীকে বোঝানো হয়েছে। আইনে ভরণপোষণের আওতায় খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সঙ্গ ও যত্নকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এ দায়িত্ব ভাগাভাগি করবে। একই সঙ্গে পিতা-মাতার জন্য একসঙ্গে বসবাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাস বা অন্য কোনো স্থানে থাকতে বাধ্য করা যাবে না।
এ ছাড়া সন্তানদের নিয়মিত পিতা-মাতার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা এবং পিতা-মাতা আলাদাভাবে বসবাস করলে নিজের আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত প্রদান করার কথাও আইনে উল্লেখ রয়েছে।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, পিতা না থাকলে দাদা-দাদী এবং মাতা না থাকলে নানা-নানীর ভরণপোষণের দায়িত্বও নাতি-নাতনির ওপর বর্তাবে। এ দায়িত্বও আইন অনুযায়ী ভরণপোষণের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইনের ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ৩ বা ৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া ৫(২) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তাহলে তাকেও একই অপরাধে সহায়তাকারী হিসেবে একই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন বলেন, ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ দেশের পারিবারিক মূল্যবোধ ও প্রবীণদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তার মতে, আইনের ৩ ধারায় সন্তানের জন্য পিতা-মাতার ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধনিবাসে পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা পারিবারিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তিনি আরও বলেন, ৫ ধারায় নির্ধারিত ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারী সন্তানদের জন্য কঠোর বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে ৪ ধারার মাধ্যমে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নাতি-নাতনির ওপর অর্পণ করায় পারিবারিক দায়িত্ববোধ আরও বিস্তৃত হয়েছে।
অ্যাডভোকেট খালিদ হোসাইন জানান, আইনের ৮ ধারায় আপোষ-মীমাংসার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে পারিবারিক বিরোধ আদালতের বাইরে স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের বিধিমালায় ভরণপোষণ তহবিল ও প্রবীণ পরিচর্যাকেন্দ্র গঠনের বিধান যুক্ত হওয়ায় অসহায় প্রবীণদের সহায়তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য, এ আইন কেবল শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; বরং সন্তানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়লে পারিবারিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে এবং প্রবীণরা তাদের প্রাপ্য সম্মান, নিরাপত্তা ও যত্ন পাবেন।
