প্রোটিনের ঘাটতিতে শরীরে দেখা দিতে পারে ৮টি বিপজ্জনক লক্ষণ

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: ২০২৫-১১-০২
ছবি সংগৃহীত

প্রোটিনের ঘাটতি হলে শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে—যেমন শরীর ফুলে যাওয়া (এডিমা), চুল পড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্ষুধা অনুভব, সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

প্রোটিন শরীরের অন্যতম প্রধান গঠন উপাদান, যা পেশি, ত্বক, এনজাইম ও হরমোনের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যখন খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করা হয় না, তখন শরীরে প্রোটিন ঘাটতি দেখা দেয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে মারাত্মক প্রোটিন ঘাটতি বিরল হলেও, অনেকেই খাবারে তুলনামূলক কম প্রোটিন গ্রহণ করেন, যা শরীরের নানা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য জটিলতা তৈরি করে।

সবচেয়ে গুরুতর প্রোটিন ঘাটতিকে বলা হয় কোয়াশিওকার (Kwashiorkor)। এটি সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, যেখানে পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা ও অপুষ্টি সাধারণ সমস্যা। তবে হালকা প্রোটিন ঘাটতিতেও শরীরে কিছু উপসর্গ প্রকাশ পেতে শুরু করে।

নিচে প্রোটিন ঘাটতির ৮টি সাধারণ লক্ষণ ও উপসর্গ তুলে ধরা হলো—

১. শরীরে ফোলা ভাব (Edema)

শরীরের চামড়া ফুলে যাওয়া বা পাফি হয়ে যাওয়াকে এডিমা বলা হয়, যা কোয়াশিওকারের একটি ক্লাসিক লক্ষণ।
এর মূল কারণ হলো অ্যালবুমিন (albumin) নামের প্রোটিনের ঘাটতি, যা রক্তের তরলে থেকে শরীরের ফ্লুইডের ভারসাম্য রক্ষা করে।
যখন শরীরে অ্যালবুমিনের মাত্রা কমে যায়, তখন রক্ত থেকে পানি টিস্যুতে জমে যায়, ফলে হাত-পা বা শরীরের কিছু অংশ ফুলে ওঠে।
এডিমা সাধারণত গুরুতর প্রোটিন ঘাটতিতে দেখা যায় এবং উন্নত দেশগুলোতে এটি খুবই বিরল।

২. ফ্যাটি লিভার

প্রোটিন ঘাটতির আরেকটি সাধারণ লক্ষণ হলো লিভারে চর্বি জমে যাওয়া বা ফ্যাটি লিভার
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোটিনের অভাবে লিভারে ফ্যাট জমে প্রদাহ, লিভার ক্ষতি এমনকি লিভার ফেলিওর পর্যন্ত হতে পারে।
যদিও সঠিক কারণ পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, ধারণা করা হয় যে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, কোষের শক্তিকেন্দ্র (মাইটোকন্ড্রিয়া) ও ফ্যাট পরিবহনের প্রোটিনে পরিবর্তনের কারণে এটি ঘটে।

৩. ত্বক, চুল ও নখের সমস্যা

ত্বক, চুল ও নখ মূলত প্রোটিন দ্বারা গঠিত। তাই প্রোটিনের ঘাটতি হলে এগুলোর গঠন ও বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে।
চুল সহজে পড়ে যাওয়া, পাতলা হয়ে যাওয়া (Telogen Effluvium), ত্বক ফেটে যাওয়া বা রঙ পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে গুরুতর প্রোটিন ঘাটতিতে।

৪. পেশি ক্ষয় (Muscle Loss)

শরীরের সবচেয়ে বড় প্রোটিন ভাণ্ডার হলো পেশি।
যখন খাবারে প্রোটিনের ঘাটতি হয়, শরীর তখন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর চাহিদা মেটাতে পেশি থেকে প্রোটিন ব্যবহার করে, ফলে পেশি ক্ষয় বা দুর্বলতা দেখা দেয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে সামান্য প্রোটিন ঘাটতিতেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের প্রতি পাউন্ড ওজনের জন্য কমপক্ষে ০.৫ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। যথেষ্ট প্রোটিন গ্রহণ করলে বয়সজনিত পেশিক্ষয় বা সারকোপেনিয়া (Sarcopenia) প্রতিরোধ করা যায়।

৫. হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া

কম প্রোটিন খেলে হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি প্রোটিন গ্রহণ করেন, তাদের হাড়ের ঘনত্ব কম প্রোটিন গ্রহণকারীদের তুলনায় প্রায় ৬% বেশি।
এছাড়া পাঁচ বছর পর দেখা যায়, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণকারীদের হাড় ভাঙার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রোটিন ও হাড়ের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে বুঝতে অতিরিক্ত গবেষণা প্রয়োজন।

৬. শিশুদের বৃদ্ধি থেমে যাওয়া (Stunted Growth)

শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রোটিন অপরিহার্য।
যখন শিশু পর্যাপ্ত প্রোটিন পায় না, তখন তাদের উচ্চতা ও ওজন স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় না।
২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪৯ মিলিয়ন শিশু বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত (stunted) হয়েছে।
যেসব শিশু নিয়মিত প্রোটিন কম খায়, তাদের বৃদ্ধিতে বাধার ঝুঁকি ৪ গুণ বেশি।

৭. সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া

প্রোটিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিন থেকে শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা যথেষ্ট প্রোটিন গ্রহণ করেন, তাদের সর্দি-কাশির মতো সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে কম।
তবে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

৮. অতিরিক্ত ক্ষুধা ও ক্যালরি গ্রহণ

প্রোটিন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
যখন শরীরে প্রোটিনের অভাব হয়, তখন শরীর ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয় যেন ঘাটতি পূরণ হয়।
কিন্তু তখন আমরা সাধারণত কার্বোহাইড্রেট বা চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খাই, যা সহজে পেট ভরালেও প্রোটিন ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।
ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে বেশি ক্যালরি গ্রহণ হয় এবং ওজন বেড়ে যায়।
যদি সবসময় ক্ষুধা অনুভব করেন, তাহলে ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, বাদাম ইত্যাদি উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করুন।

আপনার কতটা প্রোটিন দরকার?

প্রোটিনের চাহিদা নির্ভর করে বয়স, শরীরের ওজন, কাজের ধরন এবং ফিটনেস লক্ষ্যের ওপর।
আমেরিকান ডায়েটারি গাইডলাইন (২০২০–২০২৫) অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৪৬ গ্রাম এবং পুরুষদের জন্য ৫২–৫৬ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন।
গড়ে এটি প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৮ গ্রাম প্রোটিন হিসেবে ধরা হয়।
তবে এটি কেবল শরীরের মৌলিক চাহিদা পূরণের ন্যূনতম মাত্রা।
যদি আপনি পেশি বৃদ্ধি করতে চান, তবে প্রতি কেজিতে ১.৪–২ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত।
নিয়মিত ব্যায়ামকারী বা অ্যাথলেটদের জন্য প্রয়োজনে প্রতি কেজিতে ৩ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন উপকারী হতে পারে।

প্রোটিন শরীরের প্রতিটি অংশের জন্য অপরিহার্য—ত্বক, পেশি, চুল, হাড়, এমনকি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও।
তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ডাল, বাদাম, টোফু বা ওটসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন।
এটি শরীরকে শুধু শক্তিশালী রাখে না, দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ থেকেও সুরক্ষা দেয়।

error: Content is protected !!