৫৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে বাড়ছে কোলন ক্যানসার, দায়ী যেসব কারণ

: বালাগঞ্জের আওয়াজ
প্রকাশ: 2026-08-03
ছবি: সংগৃহীত

একসময় কোলন বা মলাশয়ের ক্যানসারকে মূলত বয়স্কদের রোগ হিসেবে মনে করা হতো। তবে গত কয়েক দশকে এই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বজুড়ে ৫৫ বছরের কম বয়সী তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষের মধ্যেও কোলন ক্যানসারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে প্রখ্যাত অনকোলজিস্ট ড. রবি কে গুপ্তের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত নতুন রোগীদের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের বয়স ৫৫ বছরের নিচে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ এই প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

গাট মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে অন্ত্রের অণুজীব বা ‘গাট মাইক্রোবায়োম’-এর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। মানুষের অন্ত্রে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া শরীরের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ফাইবারসমৃদ্ধ খাবারের ঘাটতি, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজন ছাড়া ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।

গবেষণায় E. coli এবং Fusobacterium nucleatum-এর মতো কিছু ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে।

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

সময়ের সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তরুণদের মধ্যে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের গ্রহণ বেড়েছে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফলমূল ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কমেছে।

বিভিন্ন বড় পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে বলেও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাও দায়ী

কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে মেটাবলিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভাব শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে ইনসুলিনসহ কিছু হরমোনের পরিবর্তন ক্যানসার কোষের বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

তরুণদের যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবে

তরুণ বয়সে ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেকেই বিবেচনায় না নেওয়ায় রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অবহেলিত হতে পারে। তবে নিচের যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—

  • মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া
  • দীর্ঘদিন ধরে মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন
  • কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
  • আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া

এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে কোলন ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। তবে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

৪৫ বছর বয়স থেকে স্ক্রিনিং

তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যানসারের প্রবণতা বাড়ায় রোগ শনাক্তকরণ বা স্ক্রিনিংয়ের বয়সসীমাতেও পরিবর্তন এসেছে। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি সাধারণ ঝুঁকির ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫০ বছরের পরিবর্তে ৪৫ বছর বয়স থেকে নিয়মিত কোলন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিয়েছে।

তবে পরিবারে কোলন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে কিংবা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও কম বয়সে স্ক্রিনিং শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো এবং শরীরে অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণে সহায়ক হতে পারে।

error: Content is protected !!