লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড, জ্বালানি সংকটে বন্ধ ৪১ বিদ্যুৎকেন্দ্র

: অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2026-08-11
ছবি: সংগৃহীত

দেশে বিদ্যুৎ সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা সরবরাহে জটিলতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি চালু থাকা অনেক কেন্দ্রও জ্বালানি সংকটে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব না হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা বেড়েছে। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় একবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এমন পরিস্থিতিতে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকছে। গত রোববার মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ওই দিন বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে।

এর আগে গত ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাস সংকট। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরাসরি প্রভাব পড়ে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে এসব কেন্দ্রে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম গ্যাস পাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো।

জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই আংশিক সক্ষমতায় চলছে।

একসময় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে তা কমে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে। কিছুদিন আগেও এই উৎপাদন সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল। ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো ও সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

গ্যাস সরবরাহের সংকট আরও প্রকট হয় গত ২১ জুলাই। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এর ফলে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।

প্রায় ১৫ দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে টার্মিনাল থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও এটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, টার্মিনালের মেরামত শেষ হতে আরও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হলে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের জোগান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি টার্মিনাল সচল হলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে গ্যাস সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে।

গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহের জটিলতাও বিদ্যুৎ সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বর্তমানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

এদিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশে সরবরাহ কমেছে। কেন্দ্রটি সাধারণত বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও কয়েক দিন ধরে তা কমে ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে। ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তবে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারে।

দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং বেড়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আদানি পাওয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের আশা, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। তার মতে, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দিতে হবে।

error: Content is protected !!