ছবি: সংগৃহীত
সুস্থ থাকতে আমরা সাধারণত খাবারের মান ও পুষ্টিগুণের দিকে বেশি নজর দিই। তবে কী খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি কখন খাচ্ছেন, সেটিও শরীরের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীরের অভ্যন্তরে থাকা জৈবিক ঘড়ি হজম, ক্ষুধা, রক্তে শর্করা এবং বিপাকক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। খাবারের সময় ও শরীরের এই ছন্দের সম্পর্ক নিয়ে যে গবেষণা চলছে, তাকে বলা হয় ক্রোনোনিউট্রিশন।
খাবারের সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে স্পেনের একটি প্রচলিত ধারণার কথাও বলা হয়—সকালের খাবার হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দুপুরের খাবার তুলনামূলক বড় এবং রাতের খাবার হবে হালকা। দেশটিতে দিনের প্রধান খাবার সাধারণত দুপুরে খাওয়া হয়। বিপরীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে সন্ধ্যার খাবার অনেক সময় দিনের সবচেয়ে বড় খাবার হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন গবেষণার ফল বলছে, দিনের বড় খাবার তুলনামূলক আগে খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
স্পেনের মুরসিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্তা গারাউলেত ও তার সহকর্মীরা খাবারের সময়ের সঙ্গে ওজন কমার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। ৪২০ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, একই ধরনের ২০ সপ্তাহের ওজন কমানোর কর্মসূচিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা দুপুরের খাবার আগে খেতেন, তারা দেরিতে খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি ওজন কমাতে সক্ষম হন।
আরেক গবেষণায় ৩২ জন সুস্থ নারীকে একই ধরনের খাবার দেওয়া হলেও খাবারের সময় আলাদা রাখা হয়। এতে দেখা যায়, দুপুরের খাবার দেরিতে খেলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কিছুটা কমে এবং শরীর কার্বোহাইড্রেট পোড়ানোর ক্ষেত্রেও কম কার্যকর হয়।
শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঘুম, জাগরণ, হজম ও বিপাকের মতো নানা শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। রাতে যখন শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের প্রস্তুতি নেয়, তখন ভারী খাবার খেলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে খাবারের সময়ের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। একে বলা হয় সার্কাডিয়ান মিসঅ্যালাইনমেন্ট।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় ৮০০ জনের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। তাদের গ্লুকোজসমৃদ্ধ পানীয় দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ঘুমানোর মাত্র এক ঘণ্টা আগে এটি গ্রহণ করলে শরীর চার ঘণ্টা আগে গ্রহণ করার তুলনায় গ্লুকোজ প্রক্রিয়াজাত করতে কম সক্ষম হয়। দেরিতে গ্রহণের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকে এবং ইনসুলিন নিঃসরণও কম হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এর সঙ্গে মেলাটোনিন হরমোনের সম্পর্ক থাকতে পারে। ঘুমের সময় যত ঘনিয়ে আসে, শরীরে মেলাটোনিনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এ সময় খাবার গ্রহণ করলে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে।
রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার প্রভাব পরের দিনের ক্ষুধার ওপরও পড়তে পারে। খাবারের সময়ের পরিবর্তন ক্ষুধা ও পেট ভরা থাকার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে লেপটিন অন্যতম, যা মস্তিষ্ককে শরীরের খাবারের প্রয়োজন মিটেছে বলে সংকেত দেয়।
গবেষণায় দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে শরীরে চর্বি জমা এবং বেশি বিএমআইয়ের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা এক গবেষণায় স্থূলতার ঝুঁকি বেশি থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে দেরিতে খাবার খাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে বেশি বডি মাস ইনডেক্সের সম্পর্ক দেখা যায়।
খাবারের সময় হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফ্রান্সে এক লাখের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সকালে তুলনামূলক দেরিতে নাশতা করেন, তাদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, সন্ধ্যার খাবার আগে খেলে রাতের খাবার থেকে পরদিনের নাশতা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা সম্ভব হয়। এই দীর্ঘ বিরতিও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ সবার রাতের খাবার বাদ দেওয়া উচিত—এমন নয়। যারা রাতে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে কাজের সময় ও শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
মানুষের শারীরিক ছন্দও এক রকম নয়। কেউ সকালে দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন, আবার কেউ রাতে বেশি কর্মক্ষম থাকেন। শরীরের এই স্বাভাবিক সময়ের ধরনকে বলা হয় ক্রোনোটাইপ।
সকালে বেশি সক্রিয় ব্যক্তিরা সাধারণত দিনের শুরুতেই খাবার খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। অন্যদিকে রাতে বেশি সক্রিয় ব্যক্তিদের খাবারের সময়ও পিছিয়ে যেতে পারে। তবে নিয়মিত দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা এবং ওজন বাড়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই রাতের খাবারের সময় একেবারে হঠাৎ বদলে না দিয়ে ধীরে ধীরে কিছুটা এগিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের ঘাটতি ক্ষুধা বাড়াতে এবং বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
কিছু গবেষণায় মুরগি, স্যামন বা টুনার মতো ট্রিপটোফ্যানসমৃদ্ধ প্রোটিন ঘুমের জন্য উপকারী হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে, সুস্থ থাকার জন্য শুধু খাবারের তালিকা নয়, খাবারের সময়ের দিকেও নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবার জন্য একই সময়কে ‘আদর্শ’ বলা যায় না। ঘুম, কাজের সময়, দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং শরীরের নিজস্ব ছন্দ বিবেচনা করেই খাবারের সময় নির্ধারণ করা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত।
অর্থাৎ, সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে শুধু প্লেটে কী আছে সেটিই নয়—ঘড়িতে কয়টা বাজছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
