পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তিব্যবস্থার উদ্যোগ

: অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 2026-08-23
ছবি: সংগৃহীত

উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। কেউ ভর্তি কোচিংয়ে ব্যস্ত, আবার কেউ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে পরিকল্পনা করছেন। প্রতিবছর ভর্তি মৌসুমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আবেদন, পরীক্ষা ও যাতায়াত করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ পরিস্থিতি কমাতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এর অংশ হিসেবে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে একটি ‘কেন্দ্রীয় ভর্তি ক্যালেন্ডার’ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন গ্রহণ, ভর্তি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ এবং চূড়ান্ত ভর্তি শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা খাতের রূপান্তরে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদসহ কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে আসতে পারে ভর্তি ক্যালেন্ডার

বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের প্রয়োজন ও সুবিধা অনুযায়ী পৃথক ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এরপর আবেদন, ভর্তি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, সাক্ষাৎকার ও ভর্তি কার্যক্রম শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম একটি শিক্ষাবর্ষের শেষ দিকে শুরু হয়ে পরবর্তী বছরের শুরুর দিক পর্যন্ত চলতে থাকে।

এতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। একই দিনে বা কাছাকাছি সময়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হলে পছন্দের সব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দেওয়াও সম্ভব হয় না। আবার নিজ জেলা বা বিভাগের বাইরে পরীক্ষা দিতে হলে যাতায়াত ও থাকার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়।

এই ভোগান্তি কমাতে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কখন আবেদন শুরু হবে, কখন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং কখন ফল ও ভর্তি কার্যক্রম শেষ হবে—এসব বিষয় সমন্বয় করে একটি সময়সূচি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইউজিসিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী।

বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই বড় চ্যালেঞ্জ

সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে দেশের বড় ও পুরোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে পরিচালিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বিশেষ আইনের আওতায় নিজস্ব নিয়মে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে।

এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োজন বিবেচনায় আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হলে উপযুক্ত শিক্ষার্থী নির্বাচন করা সহজ হয়।

তবে পৃথক ভর্তি পরীক্ষার কারণে বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীকে সামলাতে প্রশাসনিক ব্যয়ও বাড়ে। একই সঙ্গে আবেদন ফি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় হয়। ফলে গুচ্ছ বা সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থায় যাওয়ার বিষয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনাগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

গুচ্ছ পদ্ধতিতেও ভাঙন

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমানোর উদ্দেশ্যে কয়েক বছর আগে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে জিএসটি গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হয়। একটি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থাকায় শুরুতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ পদ্ধতি বেশ সাড়া ফেলে। প্রকৌশল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও পৃথক গুচ্ছ ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে জিএসটি গুচ্ছ ব্যবস্থায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ থেকে বের হয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভর্তি পরীক্ষা নেয়। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ও গুচ্ছ ব্যবস্থা থেকে বের হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন বলেন, গুচ্ছ পদ্ধতিতে থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রত্যাশিত মানের শিক্ষার্থী পাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ ব্যবস্থায় যুক্ত হলে এটি আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

একাদশ শ্রেণির ভর্তিতেও পরিবর্তন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যে তিন ধাপে আবেদন করা হয়, তা পরিবর্তন করে এক ধাপেই অনলাইনে আবেদন নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আগের মতো মাইগ্রেশনের সুযোগ না রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত ১৬ আগস্ট একাদশ শ্রেণির ভর্তি নীতিমালা কমিটির বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে পুনর্নিরীক্ষার পর কোনো শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হলে তাকে নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে আবেদন করেও কলেজ না পাওয়া, নিশ্চায়ন না করা কিংবা অন্য কোনো কারণে ভর্তি কার্যক্রম থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় আবেদনের সুযোগ রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে।

একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমও দ্রুত শেষ করতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আবেদন শুরু করে একই মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যে ক্লাস শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, একাদশ শ্রেণির ভর্তি নীতিমালা নিয়ে কাজ চলছে। ভর্তি কার্যক্রম ও ক্লাস শুরুর সময় এগিয়ে এনে শিক্ষাব্যবস্থায় একাডেমিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

error: Content is protected !!